
সাবিত রিজওয়ান
ফেসবুকের নানান সাহিত্য গ্রুপ একসময় ছিল লেখকদের মুক্ত আড্ডাখানা এমন এক জায়গা, যেখানে নতুন পুরোনো সবাই সমান উদ্যমে লিখত, পাঠক সমালোচকেরা মতামত দিতেন, আর গড়ে উঠত এক ধরনের সাহিত্যিক বন্ধন। কিন্তু ক্রমে সেই পরিবেশ বদলে গেছে। আজকাল এসব গ্রুপে ঢুকলেই মনে হয় সাহিত্য নয় দলাদলি, ক্ষমতার দাপট আর রাজনীতিই যেন মূল কার্যক্রম। ফলে আগের মতো লিখতে ইচ্ছে করে না; বরং মনে হয় নিজের শ্রম ও আবেগকে ভুল জায়গায় নষ্ট করা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো যাঁরা নিজেদের বিচারক বা সাহিত্য কমিটির সদস্য বলে পরিচয় দেন, তাঁদের আচরণের অদ্ভুততা। তাঁরা যেন সাহিত্যকে ভালোবাসার জায়গা থেকে বিচার করেন না; বরং কে কার লোক, কে কোন দলের, কে কখন তাঁদের প্রশংসা করেছে এসব হিসেব করে সিদ্ধান্ত নেন। তাঁদের অনেকেরই লেখালেখির জ্ঞান বা অভিজ্ঞতা সীমিত, অথচ ক্ষমতার লোভে তাঁরা বিচারকের পোশাক পরে বসেন। বিচারকের নামের সামনে ‘কমিটি’, ‘পরিষদ’, ‘প্যানেল’ এসব শব্দ দেখে অনেকে ভেবে বসেন, এঁরা নাকি মহাসাহিত্যিক! অথচ বাস্তবে দেখা যায় তাঁদের রুচি সংকীর্ণ, দৃষ্টিভঙ্গি পক্ষপাতদুষ্ট, আর সৃজনশীলতা নিয়ে তাঁদের ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
এইসব কারণে বহু যোগ্য লেখা, যা নিঃসন্দেহে বিজয়ী হওয়ার মতো শক্তি রাখে, তা উপেক্ষিত হয়। কোনো একজন গুণী লেখকের লেখা শুধুমাত্র কারও ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে বাদ পড়ে যায়; আবার মাঝারি মানের লেখা শুধুমাত্র পরিচিতি বা সম্পর্কের কারণে পুরস্কার পেয়ে যায়। এতে করে যারা মন দিয়ে লিখে, তারা হতাশ হয়, ক্ষুব্ধ হয়, এবং ধীরে ধীরে এইসব গ্রুপ থেকে দূরে চলে যায়। ফলে গ্রুপগুলোও নিষ্প্রাণ হয়ে পড়ে—লেখা কমে, আলোচনার মান কমে, আর শেষমেশ গ্রুপগুলো অচল হয়ে যায়। অনেক সাহিত্য পরিষদও ঠিক এভাবেই নিভে গেছে।
অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে এখন অনেক কবি লেখক গ্রুপ নির্ভরতা ছাড়ছেন। তাঁরা মনে করেন পত্রিকা, সাহিত্য ম্যাগাজিন বা স্বাধীন প্ল্যাটফর্মই ভালো; যেখানে অন্তত পক্ষপাতিত্বের বদলে লেখাকে প্রধান্য দেওয়া হয়। তাই সাম্প্রতিক সময়ের প্রবণতা হলো গ্রুপমুখী লেখালেখির পরিবর্তে পত্রিকামুখী বা ব্যক্তিগত ব্লগমুখী হওয়া।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো এ সব কথা বলা মানেই কিছু মানুষ তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। যেন সমালোচনা নয়, তাঁদের সামনে আয়না ধরাটাই বড় অপরাধ। কিন্তু সত্য কখনো লুকোয় না। সাহিত্যকে ভালোবেসে যারা লিখে, তারা জানে পদবি নয়, লেখার মানই আসল। আর যে দিন সাহিত্য গ্রুপগুলো এই সত্যটিকে সম্মান করতে শিখবে, সেদিনই সত্যিকারের সাহিত্যচর্চা ফিরে আসবে।