
“এই ট্রেন তো আমাদের না মা!”— ছোট্ট একটি বাক্য, কিন্তু এর গভীরতা হিমালয়ের সমান। এটি কেবল একজন বাবার অসহায় স্বীকারোক্তি নয়, বরং আমাদের ঘুণে ধরা সমাজব্যবস্থা, পদ্ধতিগত দুর্নীতি এবং সাধারণ মানুষের অধিকার হরণের এক জীবন্ত দলিল। ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী এক্সপ্রেস ট্রেনে একটি এসি কামরায় বসে যখন আমি এই কথাটি শুনলাম, তখন মুহূর্তেই আমার চারপাশের ঝকঝকে বিলাসিতা ম্লান হয়ে গেল।
কমলাপুর স্টেশন থেকে যখন এক্সপ্রেস ট্রেনে উঠলাম, তখন মনে হয়েছিল যাত্রাটা হবে প্রশান্তির। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত বগির নরম সিটে বসে বাইরের ধুলোবালি আর কোলাহল থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন মনে হচ্ছিল। আমার পাশের সিটে বসলেন একজন রেলওয়ে পুলিশের সদস্য। আলাপের এক পর্যায়ে তিনি জানালেন, এসি বগিতে শতাধিক সিট খালি থাকায় তিনি এখানে আরাম করে বসেছেন। কিন্তু সেই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হলো না।
চোখের সামনে শুরু হলো এক অদ্ভুত ‘ম্যাজিক’। একজন গার্ড বগিতে দফায় দফায় লোক নিয়ে আসতে লাগলেন। কোনো টিকিট নেই, কোনো নিয়ম নেই—শুধু কিছু অর্থের বিনিময়ে অবিক্রীত সিটগুলো পূর্ণ হতে লাগল। অ্যাপে যেখানে সিট খালি দেখাচ্ছে, বাস্তবে সেখানে মানুষের ভিড়। এই চুরির সাক্ষী হয়ে বসে থাকাটা তখন অসহ্য মনে হতে লাগল।
সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্যটি দেখলাম যখন ওয়াশরুমে যাওয়ার জন্য সিট থেকে উঠলাম। দরজার পাশে, মেঝের নোংরা পরিবেশে গাদাগাদি করে বসে আছে একদল মানুষ। তাদের অপরাধ—তারা সিস্টেমকে ‘ম্যানেজ’ করার মতো টাকা দিতে পারেনি অথবা তাদের হয়তো সেই বিলাসিতার সামর্থ্য নেই। ঠিক সেখানেই দেখলাম ৫ বছরের সেই ছোট্ট মেয়েটিকে। তার নিষ্পাপ চোখে একরাশ বিস্ময়। সে দেখছে, ভেতরটা কী সুন্দর, কত আরামের সিট খালি পড়ে আছে, অথচ তারা কেন নিচে বসে?
সে যখন তার বাবাকে জিজ্ঞেস করল, “বাবা, এতো বড় টেনে আমাদের কেন বসতে দিচ্ছে না?”—তখন সেই বাবার নীরবতা ছিল যেকোনো বজ্রপাতের চেয়েও ভয়াবহ। কিছুক্ষণ পর তিনি ম্লান হেসে বললেন, “এই ট্রেন তো আমাদের না মা! তুমি এখন বাবার কোলে থাকো। বাড়িতে গিয়ে বাবার বাইকে উঠো!”
এই কথাটি আমার বুকে তীরের মতো বিঁধল। কেন এই ট্রেন তাদের হবে না? এই রাষ্ট্র, এই রেলওয়ে, এই সম্পদ—সব তো জনগণের। কিন্তু দুর্নীতির কালো থাবায় আজ সাধারণ মানুষ নিজ দেশেই পরবাসী। যে শিশুটি আজ দেখল তার বাবার কোনো অধিকার নেই এই সুন্দর কামরায় বসার, তার মনে রাষ্ট্র সম্পর্কে কী ধারণা জন্মাবে? এই বৈষম্যই কি আমরা আগামী প্রজন্মের জন্য রেখে যাচ্ছি?
সবচেয়ে বিস্ময়কর এবং লজ্জাজনক বিষয় হলো এই দুর্নীতির প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। টিকিট চেকাররা যখন এলেন, তারা কেবল আমাদের মতো বৈধ টিকিটধারীদের টিকিট দেখলেন। অথচ গার্ড যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে বসিয়েছেন, তাদের দিকে একটিবার তাকিয়েও দেখলেন না। এক অদৃশ্য সমঝোতা আর টাকার ভাগাভাগি যেন পুরো বগিটিকে একটি অপরাধস্থলে পরিণত করেছে।
সরকারি কোষাগারে যেখানে রাজস্ব যাওয়ার কথা, সেখানে সেই টাকা চলে যাচ্ছে কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর পকেটে। আর সাধারণ মানুষ, যারা কর দিচ্ছে, তারাই আজ অবহেলিত। এক্সপ্রেস ট্রেনের সেই কামরাটি যেন হয়ে উঠল গোটা বাংলাদেশের এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। যেখানে নিয়ম কেবল সাধারণ মানুষের জন্য, আর অনিয়ম হলো প্রভাবশালীদের হাতিয়ার।
আমরা প্রায়ই শুনি রেলওয়ে লোকসানে চলছে। কিন্তু এই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা বলে দিল, লোকসান আসলে রেলওয়ের নয়, লোকসান হচ্ছে রাষ্ট্রের সততার। যদি প্রতিটি ট্রেনে এভাবে শত শত সিট কালোবাজারি আর গার্ডদের পকেটে চলে যায়, তবে সরকার রাজস্ব পাবে কোথা থেকে? দুর্নীতি যখন রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করে, তখন বড় বড় মেগা প্রজেক্টও সাধারণ মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারে না।
”এই ট্রেন তো আমাদের না মা”—এই বাক্যটি আমাদের সমাজের রূঢ় বাস্তবতা। যতক্ষণ পর্যন্ত ৫ বছরের ওই শিশুটি নিজের দেশের সম্পদকে নিজের বলে ভাবতে না পারবে, যতক্ষণ পর্যন্ত একজন বাবাকে তার সন্তানের সামনে অসহায় হয়ে মিথ্যে বলতে হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের তথাকথিত উন্নয়ন অর্থহীন।
এই দুর্নীতির বিষবৃক্ষ উপড়ে ফেলতে না পারলে আমরা শুধু রেললাইনের উন্নয়নই দেখব, মানুষের অধিকারের নয়। আমাদের দাবি তুলতে হবে স্বচ্ছতার, জবাবদিহিতার। আমরা চাই এমন এক বাংলাদেশ, যেখানে কোনো বাবাকে তার সন্তানের প্রশ্নের উত্তরে বলতে হবে না—“এই দেশ আমাদের না মা।” বরং প্রতিটি নাগরিক বুক ফুলিয়ে বলতে পারবে, এই রাষ্ট্র, এই সম্পদ এবং এই ট্রেন—সব আমাদের।