
মধুপুর গ্রামের নাম শুনলেই মানুষের মনে ভেসে ওঠে এক শান্ত, সবুজে ঘেরা, নিরিবিলি গ্রাম। সেই গ্রামেরই একজন অদ্ভুত মানুষ ছিল—মধু মিয়া। গ্রামের লোকজন তাকে খুব ভালোবাসত, কিন্তু একই সাথে একটু হাসিও করত। কারণ, মধু মিয়া ছিল ভীষণ রসিক, কথায় ছিল মিষ্টি, কিন্তু মাথায় ছিল একটু কম বুদ্ধি। লোকজন বলত, “মধুর মুখে মধু, কিন্তু মাথায় যেন বাতাস!”
মধু মিয়ার একটা বড় দুঃখ ছিল—তার কোনো সন্তান নেই। এ নিয়ে সে মাঝে মাঝেই চিন্তায় পড়ে যেত, আবার কখনো নিজের রসিকতা দিয়ে নিজেকেই সান্ত্বনা দিত। একদিন হাটে বসে চা খেতে খেতে সে শুনল, পাশের গ্রামের এক দরবেশ পীর সাহেব আছেন, যার দোয়ায় নাকি নিঃসন্তানদের ঘরে সন্তান আসে।
এই খবর শুনে মধু মিয়ার চোখ চকচক করে উঠল। সে ভাবল, “আরে! এ তো আমার জন্যই! এতদিন আমি ভুল জায়গায় খুঁজছিলাম, এখন বুঝি সমাধান পেয়ে গেলাম!” পরদিন সকালেই নতুন লুঙ্গি পরে, মাথায় টুপি দিয়ে, হাতে এক ঝুড়ি কলা নিয়ে রওনা দিল সেই পীর দরবেশের কাছে। অনেক পথ হেঁটে অবশেষে পৌঁছে গেল দরবারে।
দরবেশ পীর সাহেব তখন তসবিহ পড়ছিলেন। মধু মিয়া গিয়ে সম্মান করে বলল, —বাবা, আসসালামু আলাইকুম।
পীর সাহেব মাথা তুলে বললেন, —ওয়ালাইকুম আসসালাম। বলো, কী চাই?
মধু মিয়া বিনয়ের সাথে বলল, —বাবা, আপনি আল্লাহর কাছে আমার জন্য দোয়া করেন। আমার যেন একটা সন্তান হয়।
পীর সাহেব কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললেন, —আচ্ছা, আমি দোয়া করছি। আল্লাহ তোমার মনের আশা পূরণ করুন।
মধু মিয়া খুশিতে আটখানা হয়ে গেল। সে মনে মনে ভাবল, “এবার তো কাজ হয়ে গেছে!”
এক বছর কেটে গেল। কিন্তু কোনো খবর নেই। মধু মিয়ার ঘরে কোনো সন্তান এল না।
তাই একদিন সে আবার সেই পীর দরবেশের কাছে গেল।
গিয়ে একটু রাগী গলায় বলল, —বাবা, আপনি কেমন দোয়া করলেন? এক বছর হয়ে গেল, আমার তো কোনো সন্তান হলো না!
পীর সাহেব একটু অবাক হলেন, তারপর আবার শান্তভাবে বললেন, —আচ্ছা, আমি আবার দোয়া করছি। আল্লাহ চাইলে হবে।
মধু মিয়া আবার খুশি হয়ে ফিরে এল।
আরও এক বছর কেটে গেল। তবুও কোনো পরিবর্তন নেই।
এবার সে একটু বিরক্ত হয়েই আবার পীর সাহেবের কাছে গেল। গিয়ে বলল, —বাবা, আপনি তো শুধু দোয়া করেন, কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না! আমার তো এখনো সন্তান হলো না!
পীর সাহেব এবার একটু কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, —তুমি কি বিয়ে করেছ?
মধু মিয়া অবাক হয়ে বলল, —না বাবা! বিয়ে তো করি নাই!
পীর সাহেব তখন নিজের কপালে হাত দিয়ে বললেন, —হায় আল্লাহ! এই লোকটা তো আসলেই বোকা! তুমি বিয়েই করো নাই, তাহলে সন্তান হবে কীভাবে?
মধু মিয়া হতবাক! সে বলল, —আরে বাবা! এই কথা তো আপনি আগে বলেন নাই!
পীর সাহেব একটু হাসলেন, —প্রথমেই তো এসব বুঝতে হয়! যাও, আগে বিয়ে করো, তারপর আবার আসো।
মধু মিয়া লজ্জা পেয়ে মাথা নিচু করে চলে এল।
গ্রামে ফিরে এসে সে ভাবল, “আচ্ছা, বিয়ে না করলে সন্তান হয় না! এ কথা তো আমার মাথায়ই আসে নাই!”
তারপর গ্রামের এক সহজ-সরল মেয়েকে বিয়ে করল। মেয়েটিও ছিল একটু সরল, তবে বুদ্ধিতে মধু মিয়ার চেয়ে একটু এগিয়ে।
বিয়ের পর মধু মিয়া বেশ খুশি। সে তার স্ত্রীকে নিয়ে সুখে দিন কাটাতে লাগল। তবে তার রসিকতা আগের মতোই রয়ে গেল।
একদিন বিকেলে, তারা দুজন উঠানে বসে গল্প করছিল।
মধু মিয়া হঠাৎ করে আবেগে ভেসে বলল, —শোনো, আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি। আমার অন্তরের চেয়েও বেশি, কলিজার চেয়েও বেশি!
তার স্ত্রী একটু মুচকি হেসে বলল, —তাই নাকি?
—হ্যাঁ, একদম সত্যি!
স্ত্রী তখন একটু দুষ্টুমি করে বলল, —তাহলে প্রমাণ দাও!
মধু মিয়া অবাক হয়ে বলল, —কীভাবে প্রমাণ দেব?
স্ত্রী বলল, —এখানে তো ছুরি নেই, তবে কাঁচি আছে। কাঁচি দিয়ে একটু কেটে দেখি, সত্যি তুমি আমাকে কলিজার চেয়েও বেশি ভালোবাসো কিনা!
এই কথা শুনে মধু মিয়ার চোখ কপালে উঠল!
সে তো একেবারে হতবাক! মনে মনে ভাবল, “এ আবার কী বিপদ! ভালোবাসার কথা বলতে গিয়ে এবার বুঝি প্রাণটাই যাবে!”
সে তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়াল।
বলল, —আরে আরে! আমি তো কথার কথা বলেছি! তাই বলে কি কলিজা কেটে দেখাতে হবে নাকি?
স্ত্রী তখন হেসে বলল, —তুমি তো বলেছিলে খুব ভালোবাসো!
মধু মিয়া একটু পিছিয়ে যেতে যেতে বলল, —ভালোবাসি ঠিকই, কিন্তু তাই বলে নিজের কলিজা কেটে প্রমাণ দিতে হবে—এটা তো কেউ বলে নাই!
এরপর আর দাঁড়ায় না, সোজা দৌড়!
স্ত্রী পেছন থেকে হেসে বলল, —এই যে! কোথায় যাও?
মধু মিয়া দৌড়াতে দৌড়াতে বলল, —আমি একটু বাইরে যাচ্ছি! ভালোবাসা নিয়ে একটু ভাবতে হবে!
গ্রামের লোকজন এই ঘটনা শুনে হেসে গড়াগড়ি খেতে লাগল।
একজন বলল, —মধু মিয়ার ভালোবাসা খুব গভীর, কিন্তু কলিজা পর্যন্ত যায় না!
আরেকজন বলল, —ওর ভালোবাসা মুখে, কাজে না!
মধু মিয়া এসব শুনে একটু লজ্জা পেলেও নিজের স্বভাব ছাড়ল না।
সে বলল, —আরে ভাই, ভালোবাসা মানে কি কলিজা কাটা? ভালোবাসা মানে হচ্ছে মনের ব্যাপার!
একজন মজা করে বলল, —তাহলে আগে চিন্তা করে কথা বলবা!
এই ঘটনাটার পর থেকে মধু মিয়া একটু সাবধানে কথা বলতে শিখল। অন্তত “কলিজার চেয়েও বেশি ভালোবাসি” এই কথাটা আর সহজে বলত না!
তবে তার রসিকতা একটুও কমেনি। সে এখনও গ্রামের আড্ডায় বসে মজার মজার কথা বলে সবাইকে হাসায়।
আর সেই পীর দরবেশের ঘটনা? সেটাও সে মাঝে মাঝে নিজেই বলে হাসায়।
সে বলে, —আমি তো দুই বছর শুধু দোয়ার পিছনে দৌড়াইছি, বিয়ার কথাই মাথায় আসে নাই!
সবাই তখন হেসে ওঠে।
এই গল্প থেকে গ্রামের লোকজন একটা জিনিস শিখল—শুধু দোয়া করলেই হয় না, তার সাথে সঠিক কাজটাও করতে হয়। আর মধু মিয়া শিখল—কথা বলার আগে একটু ভেবে বলতে হয়!
মধুপুর গ্রামে আজও যখন সন্ধ্যায় আড্ডা বসে, তখন কেউ না কেউ মধু মিয়ার গল্প তুলে ধরে, আর হাসির রোল পড়ে যায়।
মধু মিয়া তখন মুচকি হেসে বলে, —হাসো হাসো, কিন্তু মনে রাখো—আমি না থাকলে তোমাদের এই হাসিটাই থাকত না!
এভাবেই নিজের সরলতা, বোকামি আর রসিকতা দিয়ে মধু মিয়া গ্রামের সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছিল।
তার জীবনে হয়তো বড় কোনো সাফল্য ছিল না, কিন্তু সে ছিল সবার হাসির কারণ—আর এই আনন্দ দেওয়াটাই ছিল তার সবচেয়ে বড় গুণ।
শেষ কলমে, মাওলানা মোঃ ফরিদুল ইসলাম
প্রভাষক হাদীস পরানপুর কামিল মাদ্রাসা মান্দা, নওগাঁ।
ভূতপূর্ব আরবি প্রভাষক বলদীআটা ফাজিল মাদ্রাসা।
ধনবাড়ী, টাঙ্গাইল।