
এস এম জাকারিয়া,
এ পৃথিবীতে আল্লাহ তায়া’লা মানব জাতির হেদায়েতের জন্য যুগেযুগে আসমানী কিতাব সহকারে নবী ও রাসূলগণকে পাঠিয়েছিলেন। সেই ধারাবাহিকতায় আমাদের আল্লাহর প্রিয় হাবিব, আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী। যিনি এই পৃথিবীতে এসেছিলেন সাইয়্যেদুল মুরসালিন, খাতামুন নাবিয়্যিন এবং রাহমাতুল্লিল আ’লামিন হিসেবে। আর সেই জন্যই জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রেই রাসূল সাঃ এর পূর্ণ অনুসরণ করতে হবে। কেননা রাসূলের অনুসরণ ছাড়া কখনোই পূর্ণ মু’মিন হওয়া সম্ভব নয়। যার অসংখ্য প্রমাণ কুরআন ও হাদীসে পাওয়া যায়। যেমন –
✔✔ আল্লাহ তায়া’লা এ বিষয়ে নির্দেশ দিয়ে কুরআনের সূরা হাশরের ৭নং আয়াতে বলেছেন –
” রাসুল তোমাদেরকে যা দেয়, তা তোমরা গ্রহণ কর এবং যা থেকে তোমাদেরকে নিষেধ করে তা থেকে বিরত থাক এবং তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর; নিশ্চয় আল্লাহ শাস্তি দানে কঠোর “।
এবিষয়ে হাদীসে এসেছে –
” আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমি যে ব্যাপারে তোমাদেরকে (বর্ণনা না দিয়ে) ছেড়ে দিয়েছি, সে ব্যাপারে তোমরা আমাকে ছেড়ে দাও (অর্থাৎ, সে ব্যাপারে আমাকে প্রশ্ন করো না)। কারণ, তোমাদের পূর্ববর্তীরা তাদের অধিক প্রশ্ন করার এবং তাদের নবীদের সঙ্গে মতভেদ করার ফলে ধ্বংস হয়ে গেছে। সুতরাং আমি যখন তোমাদেরকে কোন জিনিস থেকে নিষেধ করব, তখন তোমরা তা হতে দূরে থাক। আর যখন আমি তোমাদেরকে কোন কাজের আদেশ দেব, তখন তোমরা তা সাধ্যমত পালন কর “। ( সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে আবু দাউদ, সুনানে নাসাঈ )
✔✔ যারা অনুসরণ না করে বরং বিরুদ্ধাচরণ করে তাদের বিষয়ে আল্লাহ তায়া’লা সূরা নূরের ৬৩নং আয়াতে বলেছেন –
” সুতরাং যারা তার আদেশের বিরুদ্বাচরণ করে তারা সতর্ক হোক যে, বিপর্যয় অথবা কঠিন শাস্তি তাদেরকে গ্রাস করবে “।
একই বিষয়ে সূরায়ে আহযাবের ৩৬নং আয়াতে আল্লাহ তায়া’লা বলেছেন –
” আর যে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নাফরমানী করল, সে নিঃসন্দেহে সুস্পষ্টভাবে গোমরাহ (পথভ্রষ্ট) হলো “।
আর সূরা জ্বীনের ২৩নং আয়াতে বলা হয়েছে –
“আর যে- কেউ আল্লাহ ও তাঁর রাসূলকে অমান্য করে তার জন্য রয়েছে জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরদিন থাকবে “।
এবিষয়ে সহীহ মুসলিমের হাদিসে এসেছে রাসূল সাঃ বলেছেন- ” যে কেউ এমন আমল করবে যা করতে আমরা নির্দেশ দেই নি, তা প্রত্যাখ্যাত “।
রাসূল সাঃ আরো বলেছেন – ” যে আমার আদর্শের প্রতি বিরাগভাজন হয় সে আমার দলভুক্ত নয় “। ( সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম, সুনানে নাসাই, মুসনাদে আহমদ )
✔✔ রাসূল সাঃ কেই একমাত্র অনুসরণ করতে হবে, কেননা তিনি কখনোই নিজের মনগড়া কথা বলেন না। এবিষয়ের প্রতি নিশ্চয়তা দিয়ে আল্লাহ তায়া’লা সূরা নাজমের ৩-৪নং আয়াতে বলেছেন –
” সে মনগড়া কথাও বলে না। তা তো অহী, যা তার প্রতি প্রত্যাদেশ হয় “।
✔✔ রাসূল সাঃ নিজের মতো করে কিছুই বলতেন না, বরং সর্বদা আল্লাহর নির্দেশনা অনুযায়ী বলতেন। এই বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আল্লাহ তায়া’লা সূরা হাক্কাহ তে বলেছেন –
” আর যদি সে আমার সম্পর্কে কিছু কথা মনগড়াভাবে বলতো, তাহলে আমি তাকে হাত দিয়ে পাকড়াও করতাম, অতঃপর তার ঘাড়ের রগ কেটে ফেলতাম। তখন তোমাদের কেউ তাকে রক্ষা করতে পারতো না “।
✔✔ এই পৃথিবীতে রাসূলগণ এসেছেনই মানুষ যেনো তাদের অনুসরণ করার মাধ্যমে সৎপথ পায়। আল্লাহ তায়া’লা সূরা নিসার ৬৪ নং আয়াতে বলেছেন –
” আল্লাহর অনুমতিক্রমে কেবলমাত্র আনুগত্য করার জন্যই আমরা রাসূলদের প্রেরণ করেছি “।
✔✔ রাসূল সাঃ এর অনুসরণই আল্লাহ তা‘আলার অনুসরণ , এবিষয়ে আল্লাহ তায়া’লা সূরা নিসার ৮০নং আয়াতে বলেছেন:
” কেউ রাসূলের আনুগত্য করলে সে তো আল্লাহরই আনুগত্য করল “।
এবিষয়ে সহীহ মুসলিমে হাদীস এসেছে –
” আবূ হুরায়রা (রাঃ) সুত্রে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন : ” যে আমার আনুগত্য করলো, সে আল্লাহরই আনুগত্য করলো। আর যে আমার অবাধ্যতা করলো সে আল্লাহরই অবাধ্যতা করলো “।
রাসূল সাঃ এর আরেকটি হাদীসে এসেছে – আবূ হুরাইরাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন : ” আমার উম্মতের সবাই জান্নাতে যাবে; কিন্তু সে নয় যে অস্বীকার করবে। জিজ্ঞাসা করা হল, ’হে আল্লাহর রসূল! (জান্নাতে যেতে আবার) কে অস্বীকার করবে?’ তিনি বললেন, যে আমার অনুসরণ করবে, সে জান্নাতে যাবে এবং যে আমার অবাধ্যতা করবে, সেই জান্নাত যেতে অস্বীকার করবে “।
✔✔ রাসূল সাঃ এর পূর্ণ অনুসরণ করলে আল্লাহ ভালোবাসা, গুণাহ ও পাপ মোচনের ঘোষণা দিয়ে আল্লাহ তা‘আলা সূরা আলে-এমরানের ৩১নং আয়াতে বলেছেন – ” বল, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালবাস, তাহলে আমার অনুসরণ কর। ফলে আল্লাহ তোমাদেরকে ভালবাসবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করবেন “।
✔✔ রাসূল সাঃ এর অনুসরণ ও আনুগত্য করার বিষয়টিকে আল্লাহর বান্দাহদের জন্য তাঁর রহমত পাওয়ার উপলক্ষ্য বানিয়েছেন। যেমন – আল্লাহ তা‘আলা সূরা আলে-ইমরানের ১৩২নং আয়াতে বলেছেন:
” আর তোমরা আল্লাহ ও রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমরা কৃপা লাভ করতে পার “।
আল্লাহ তা‘আলা এবিষয়ে সূরা নূরের ৫৬ নং আয়াতে আরও বলেছেন:
” আর তোমরা রাসূলের আনুগত্য কর, যাতে তোমাদের উপর রহম করা হয় “।
✔✔ চরিত্র ঠিক করতে হলেও রাসূল সাঃ এর অনুসরণ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। যেমন কুরআনের সূরা আহযাবের ২১নং আয়াতে বলা হয়েছে –
” তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহ ও পরকালকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূলুল্লাহর (চরিত্রের) মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে “।
মুসনাদে আহমদ এর একটি দীর্ঘ হাদীসের একটা অংশে এসেছে
” হযরত সাঈদ বিন হিশাম হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : ” আমি হযরত আয়েশা রাঃ কে প্রশ্ন করলাম, রাসূল সাঃ এর চরিত্র কেমন ছিলো? উত্তরে তিনি বললেন : ” তাঁর চরিত্র ছিল কুরআন “।
আর রাসূল সাঃ ইরশাদ করে গেলেন –
” রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন : ” আমি তোমাদের মধ্যে দু’টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যতক্ষণ তোমরা সে দু’টি জিনিস আঁকড়ে ধরে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত পথভ্রষ্ট হবে না- আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রসূলের হাদীস “। ( ইমাম মালিক মুয়াত্ত্বায় বর্ণনা করেছেন )
হাদীসের প্রসিদ্ধ কিতাব নাসাঈ ও হাকিম আল্-মুস্তাদরাক এ হাদীস এসেছে –
ইয়াযীদ ইবনে বাবানূস (রহঃ) বলেন, আমরা আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হয়ে বললাম, হে মুমিন জননী! রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর চরিত্র-বৈশিষ্ট্য কি ছিল? তিনি বলেন, কুরআনই ছিল তার চরিত্র। আপনার সূরা মুমিনূন পড়ে থাকেন। তিনি বলেন, পড়ুনঃ “কাদ আফলাহাল মুমিনূন”। ইয়াযীদ (রহঃ) বলেন, আমি পড়লাম, “কাদ আফলাহাল মুমিনুন…. লিফুরূজিহিম হাফিযুন” পর্যন্ত (১-৫)। তিনি বলেন, এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর চরিত্র বৈশিষ্ট্য “।
এই হাদীস থেকে বোঝা গেলো পবিত্র কুরআনের যত জায়গায় যত ভাবেই মু’মিন ও উত্তম চরিত্রের বিষয়ে বলা হয়েছে সবই স্বয়ং রাসূল সাঃ এর চরিত্র ছিলো। আর এ কারণেই আল্লাহ তায়া’লা কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের মাধ্যমে বান্দাহকে জীবন চলার পথে রাসূল সাঃ কে অনুসরণ করেই জীবন অতিবাহিত করে জান্নাতের পথ সুগম করার নির্দেশনা দিয়েছেন।
আল্লাহ তায়া’লা আমাদের সকলকে আলোচ্য আয়াতে কারীমাগুলো ও হাদীসে রাসূলের উপর আমল করার এবং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে রাসূল সাঃ এর পূর্ণ অনুসরণ করার তাওফিক দান করুন।
( সহ সুপার, চিশতিয়া বজল আহমদ ইসলামিয়া দাখিল মাদ্রাসা, জোরারগঞ্জ, মীরসরাই, চট্টগ্রাম।)