1. admin@ichchashakti.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৪ পূর্বাহ্ন

প্রণয়ের তিক্ততা  —– শামিম হোসেন (ইভান)

  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ১৪ নভেম্বর, ২০২৫
  • ১৬৭ বার প্রতিবেদনটি দেখা হয়েছে

এখনো পড়াশোনা নিয়ে বেশ উদ্বিগ্ন। মাত্রই উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে বিশ্ববিদ্যালয় গণ্ডিতে যাওয়ার চিন্তায় চিন্তিত। তবুও বিশ হাজার একটা তীব্র প্রভাব মনে ছাপ পড়ে আছে এক যুবকের, পড়াশোনা করছে যেন নিজের ইচ্ছের বাইরে।তার কাজের প্রতি মন নেই বললেই চলে। ঘুম নেই, শরীরে এনার্জি নেই, চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল এবং রাত জেগে দুঃখের গান শোনা এই যেন তার রুটিন। তার বেহাল দশা নিয়ে বাবা-মা খুবই চিন্তিত। বন্ধুর জিজ্ঞেস করলে বলে “ও তো ক্লাসেও এমন অমনোযোগী”। তার এমন অভূতপূর্ব পরিবর্তন কেউ মেনে নিতে পারছে না। সে মাদকদ্রব্য সেবন না করলেও ধূমপানের পরিমাণ এখন অনেকটাই বেড়ে গেছে। বাবা ছিলেন মোটামুটি ধনী পরিবারের -সেই সুবাদে তার অর্থের কোন সংকট ছিল না।

 

আচ্ছা এ প্রসঙ্গে না আগানো উচিত!

যাইহোক, সন্ধ্যার এক মুহূর্ত একদিন ‘নিহা’ নামক এক মেয়েকে দেখে ছেলেটি উদ্ভট আচরণ করে। রাস্তার একপাশে টঙের চায়ের দোকান এর সামনে এমন উদ্ভট আচরণের কারণেও নিহা কোনো প্রতিবাদ জানায় না। শুধু স্তব্ধ দর্শকের মতো মনি খানিকটা বিষন্নতা নিয়ে দাঁড়িয়ে থেকে দেখছে।ছেলেটি সিগারেট ফুকতে ফুকতে বলল ❝আলো-আঁধারি!

 

ভালো যদি না বাসতে তবে কেন আশা দেখালে আমাকে-

কেনইবা অপেক্ষা করালে আমায়! ❞

এখন পাঠক মনে একটু প্রশ্ন জেগেছে এই ছেলেটা এমন করছে উদ্ভট কথা বলছে তারপরও নিহা কেন নিশ্চুপ!

তাহলে ফিরে যেতে হবে, আজ থেকে বছর তিনেক আগে।

 

সায়ান একজন মেধাবী শিক্ষার্থী। পড়াশোনার পাশাপাশি অসাধারণ খেলাধুলা বিতর্ক প্রতিযোগিতায় বেশ পটু ছিল সে। কোন সময় তাকে অখুশি দেখা যেত না। বাবা-মা ভাইবোন সকলকে বিয়ে বেশ আনন্দে সময় কাটাচ্ছিল সে । সকাল সাতটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত স্কুল ও কোচিংয়ে সময় কাটানো তার দৈনন্দিন রুটিন। তারপরেও পাঠ্য বই পড়ার পাশাপাশি উপন্যাসে তার প্রচন্ড প্রিয়।

রবীন্দ্রনাথ, হুমায়ুন আহমেদ ও শরৎচন্দ্রের লেখা উপন্যাস অধিকাংশই তার পঠিত।এ সময় গুলো বেশ ভালোই কাটছিল তার। একদিন সে বিকেলে স্কুল মাঠে ক্রিকেট খেলছিল, এমতাবস্থায় একটা লাবণ্যময়ী শ্যাম বর্ণের বড্ড রূপবতী রমণী তার চোখে পড়ল।সায়ান তখন ব্যাটিং করছে ওর বন্ধু ফাহাদ বোলিং করলো, কিন্তু সায়ানের নজর ওই রূপবতী মেয়ের দিকে ফলে সে আউট হলো। বলা যায় সায়ান মেয়েটির প্রেমে পড়ে গেল।ইংরেজিতে যাকে বলে Love at first sight.হয়তো এই প্রথম কোন রমণীর প্রেমে পড়েছে। সে উপন্যাসে অনেকে পড়েছে প্রেমের ব্যাপারে কিন্তু এবার হয়তো তা বাস্তবেই উপলব্ধি করতে পারল। সায়ানের যেন রাতে ঘুম আসে না সারারাত শুধু তাকে নিয়ে ভাবে। কি সুন্দর তার চোখ, কি মিষ্টি হাসি, একদম ঘন কালো মেঘের মতো তার কেশ, হাসলে যেন তার গালে টল পরে এসব কিছু গল্প করতে এগুলো কল্পনা করতে শুরু করলো। পরদিন স্কুলে গিয়েই সে মেয়েটিকে আবার দেখতে পেল এবং তার ব্যাপারে খোঁজখবর নেওয়া শুরু করল। সায়ানের এক ছোট বোন খবর দিল মেয়েটির নাম নিহা।খুব সম্ভবত নবম শ্রেণীতে পড়ে। তখন সায়ান বলল-“এই ছোটু ও কিসে পড়ে?”

 

তখন তার ছোট বোন বলল-“আমার বান্ধবী -কেন তুই কি প্রেম করতে চাস নাকি ও সিঙ্গেল আছে ”

সায়ান মনে মনে ভাবল এত মেঘ না চাইতে বৃষ্টি। তখন সে মনের আনন্দে গান গাইতে শুরু করলো।ইতিমধ্যে স্কুলে আবার গ্রীষ্মকালীন ছুটি দিল। সায়ান বেড়াতে গেল তার নানার বাসায়। বেড়াতে গিয়ে এক অবাক কান্ড ঘটলো। যে কান্ডের কথা সে কখনো কল্পনাও করতে পারেনি।ভোরবেলা সায়ান তার নানার বাড়ির বারান্দায় বসে আছে ডানে তাকাতেই দেখল “নিহা”।তখন একটু মনে মনে খুশি হয়ে গেল।ইচ্ছাকৃতভাবে এগিয়ে গিয়ে বলল -“হে নিহা কি অবস্থা”

 

নিহা উত্তর দিল“এইতো ভাইয়া ভালো আছি ”।

এভাবে তাদের আলাপচারিতা শুরু হয়ে গেল। কথা বলতে বলতে তাদের মধ্যে একটা ভালো ফ্রেন্ডশিপ তৈরি হয়ে গেল। স্কুল আবার খুলে দিয়েছে,গ্রীষ্মকালীন ছুটি শেষ। হুট করে একদিন সায়ান তার এত দিনের মনের কথা খুলে বলল নিহাকে। সায়ান বলল-“নিহা, আমি তোমাকে যেদিন প্রথম দেখেছিলাম সেদিন তোমার প্রেমে পড়েছি। আর সে তখন তোমায় চিনতাম না সেভাবে বলা হয়ে ওঠেনি আজকে হুট করেই তোমাকে বলছি (ভালোবাসি)”।এ কথা শোনার পরে নিহা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। কোন উত্তর না দিয়ে জায়গাটা ছেড়ে চলে গেল। হয়তো ভেবে নিয়েছে না বলা সম্মতির লক্ষণ।অবশ্য সায়ানের ধারণাই ঠিক, কারণ পরদিন এল নিহার জবাব। নিহা বলল “সায়ান,আসলে গতকাল আমি প্রচন্ড লজ্জা পেয়েছিলাম তাই কিছু না বলে চলে গিয়েছিলাম।সারারাত আমি তোমাকে নিয়ে ভেবেছি আসলে আমিও তোমাকে প্রচন্ড ভালোবাসি ”।এই কথা শোনার পরে সায়ান যেন বিশ্বকাপ জেতার আনন্দ পেয়ে গেল। এমনকি তার চোখে জল পর্যন্ত চলে এলো। বেশ রঙিন কাটছিল সময় তাদের। গল্পের এ পর্যায়ে এসেও তোমাদের তো বলাই হলো না সায়ান দুই ক্লাসের সিনিয়র ছিল নিহার থেকে। এরই মাঝে খবর এলো আর দুই মাস পর সায়ানের এসএসসি পরীক্ষা।সায়ান নিহার সাথে সময় কাটানোর পাশাপাশি পরিক্ষার ভালো প্রস্তুতি নিতে শুরু করলো। পরীক্ষার সময় দেখা গেল খুব ভালো পরীক্ষা দিচ্ছে এবং পরীক্ষার ফলাফল খুব ভালো ছিল। সে জিপিএ ফাইভ এ পাশ করলো। সায়ান নিহার সঙ্গে দেখা করতে এল।

 

সায়ান বলল -“জানো নিহা,আমি জিপিএ ফাইভ পেয়েছি,আজকে আমি খুবই আনন্দিত।”

 

নিহা একদম চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে তার চোখের নোনা জল স্তব্ধতার মাঝে যেন হারিয়ে গিয়েছে নিহা অনেক দিন আগে।সায়ন বলল -“কি ব্যাপার তুমি এমন মনমরা হয়ে আছো কেন? ”

 

নিহা উত্তর দিল না,সে বাড়ি চলে গেল। সায়ন অনেক চিন্তিত হয়ে গেল। ভাবল হঠাৎ কি হয়েছে তার। এখানে জেনে রাখা ভালো যে, পরীক্ষার জন্য এক থেকে দেড় মাস নিহার সাথে কোনো যোগাযোগ রাখতে পারেনি। যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণেই হোক বা কথা বলার জন্যই হোক এজন্য হয়তো নিহার মনটা খারাপ -এটা সায়ানের ধারণা। কিন্তু বাস্তবতায় ঘটেছে আরেক কথা —-

 

নিহা একটা মধ্যবিত্ত পরিবারের মেয়ে। তার বাবা সাধারণ কৃষক এবং তার মা ঘরের কাজ করে বলা যায় গৃহিণী। তার দূর সম্পর্কের আত্মীয় অর্থাৎ ধরা যায় খালাতো ভাই তার নাম “রায়হান” ছেলে ভালো ব্যাংকে চাকরি করে। নিহাকে দেখে রায়হান অনেক আগেই ভালোবেসেছে। রায়হান কখনো নিহাকে এ ব্যাপারে জানায় নি।হঠাৎ করে একদিন রায়হান তার মা-বাবা কে নিয়ে নিহাদের বাসায় বেড়াতে আসে। বলা যায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে। প্রস্তাব পেয়ে অবশ্য নিহার মা বাবা খুবই খুশি হয়। এবং সেদিনই বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়। নিহা কিছু বলতে চাইল কিন্তু তাকে কিছু বলার সুযোগ দেওয়া হলো না।পরে বিবাহ ঠিক হয় রায়হান ও নিহার।নির্দিষ্ট তারিখে তাদের বিয়ে হলো। কিন্তু সায়ান এ ব্যাপারে কিচ্ছু জানতো না।

 

এরপর হুট করে আবারও সায়ান আর নিহা দেখা করলো। নিহা বললো-“ আমার শরীর খারাপ-চলো না পালিয়ে যাই,আমার বাসা থেকে বিয়ের প্রেসার দিচ্ছে। ”

 

সায়ান প্রথমে সম্মতি না থাকলেও পরবর্তীতে রাজি হলো। নিহা জানালো আগামীকাল রাতেই তারা পালাবে দূরে কোথাও।

 

কিন্ত এর মাঝেই ঘটে গেল আরেক ঘটনা। রায়হান এর মা-বাবা নিহাকে বাসায় নিয়ে যেতে চাইল।নিহা মানা করা সত্বেও তার মা-বাবা এক প্রকার জোর করেই পাঠিয়ে দেয়।সায়ান নির্দিষ্ট সময়ে অপেক্ষা করলো কিন্তু নিহার খোঁজ নেই।সারারাত অপেক্ষায় কাটিয়ে দিল সে।সায়ান এ ঘটনার পর ভেঙ্গে পড়ে।তবে আশা রাখছিল যে একদিন নিহা আসবেই। কিছুদিন পর সায়ানের বাবা তাকে নিয়ে শহরে পাড়ি জমায়। একাদশ শ্রেণিতে ভর্তির পর সায়ান জানতে পারলো নিহার বিবাহ হয়ে গেছে।কথাটা শোনার পর সে একদম নির্বাক ও স্তব্ধ হয়ে থাকলো।সে যেন ভেঙ্গে পরল একদম।কিছুটা মানসিক বিকারগ্রস্ত হয়ে গেছে সায়ান।আগের সেই নরম কোমল মানুষটি এখন খিটখিটে মেজাজে থাকে। আরো বেশ কিছু তো শুরুতেই বর্ণনা করেছি।

 

এবার আসি বর্তমানে -তো নিহাকে দেখার পরে সে কবিতাটি বলল। কিছুক্ষণ পর নিহা জায়গাটি প্রস্থান করলো।এতকিছু ঘটনা ঘটার পরে, প্রেমের এত তিক্ত অনুভূতি পাওয়ার পরে সায়ান এক যাযাবর পাখির মতো হয়ে গেছে। সায়ান বাসায় এসে একটা সিগারেট ধরালো এবং ফোন এলো কে ফোন দিয়েছে জানো?

 

ফোন দিয়েছে সেই নিহা।

নিহা তার কোমল কণ্ঠে বললো “হ্যালো, সায়ান তোমাকে কিছু কথা বলার ছিল। যা এতদিন যোগাযোগ বিচ্ছেদের কারণে বলা হয়নি। আসলে আমার সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সত্য গোপন করা। আমাকে বিয়ে দেয়া হয়েছে তোমার পরীক্ষার মধ্যে সেটা আমি তোমাকে বলেছিলাম না। তোমাকে যেদিন পালানোর কথা বলি সেদিন আমার মা-বাবা জোর করে আমাকে শ্বশুরবাড়ি পাঠিয়ে দেয়। সেখানে আমি কখনো ভালো ছিলাম না, কিছুদিন সংসার করার পর রায়হান আর আমার ডিভোর্স হয়েছে। এরপর আমি তোমাকে অনেক খুঁজেছি। তুমি যেখানে পূর্বে থাকতে সেখানেও গেছি বারবার, কিন্তু পাইনি। আজকেও পেয়েও পেলাম না তোমায়!যাইহোক তুমি যাযাবর হইয়ো না, সুস্থ হয়ে ফিরে আসো তোমার নিজের কাজ করো।ভালো থেকো।” সায়ানের চোখ দিয়ে পানি পড়ছে সে একটা কথার জবাব দিতে পারল না। কিবা করার আছে-

আগানো বা পেছানোর সুযোগ নেই ,শুধু সুযোগ আটকে থাকার।

এটাকে হয়তো বলে প্রণয়ের তিক্ততা।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ ইচ্ছাশক্তি
Theme Customized By Shakil IT Park