1. admin@ichchashakti.com : admin :
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৮ অপরাহ্ন

কেন শিশুরা পড়াশোনায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলে?

  • প্রকাশের সময় : মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১৮৭ বার প্রতিবেদনটি দেখা হয়েছে

আপনার সন্তান যদি পড়াশোনায় আগ্রহ না দেখা যায়, তবে চিন্তার কিছু নেই। অনেক বাবা-মা’ই এ নিয়ে ভোগেন। ভাবেন, কীভাবে বাড়তি চাপ না দিয়ে বা ভয় না দেখিয়ে সন্তানকে পড়ায় মনোযোগী করা যায়। এই লেখায় থাকছে কিছু সহজ ও আনন্দদায়ক উপায়, যা শিশুদের আবার শেখার আনন্দ ফিরিয়ে আনতে সাহায্য করবে।

 

কেন পড়াশোনায় আগ্রহ হারায় শিশুরা

প্রায়ই প্রি-টিন বা টিনএজ বয়সে হঠাৎ পড়াশোনায় অনীহা দেখা দেয়। সাধারণত এর প্রথম লক্ষণ দেখা যায় মাধ্যমিকে স্কুলে ওঠার পর। এ সময়ে বাবা-মায়ের মনে প্রশ্ন জাগে—কীভাবে সন্তানের পড়ায় মনোযোগ বাড়ানো যায়? এর সমাধান খুঁজতে হলে প্রথমেই জানতে হবে কেন শিশুর পড়াশোনায় আগ্রহ কমে যাচ্ছে।

 

১. বুলিংয়িং

অনেক প্রি-টিন শিশু স্কুলে বুলিং বা টিজিংয়ের শিকার হয়। এর ফলে তাদের আত্মবিশ্বাস কমে যায়, উদ্বেগ বাড়ে এবং তারা পড়াশোনায় মনোযোগ হারায়। অনেকেই স্কুল এড়িয়ে চলতে শুরু করে।

 

২. কঠিন সিলেবাস

অনেক স্কুলে পড়াশোনা অতিরিক্ত চাপযুক্ত হয়। ঘন ঘন পরীক্ষা, কঠিন অ্যাসাইনমেন্ট—এসব সামলাতে না পেরে অনেকেই হাল ছেড়ে দেয়।

 

৩. ব্যর্থতার ভয়

উচ্চতর শ্রেণিতে ওঠার পর পরীক্ষার চাপ বেড়ে যায়। বোর্ড পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য ক্রমাগত পরীক্ষা দিতে দিতে শিশুর মনে ব্যর্থতার ভয় তৈরি হয়, যা পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমিয়ে দেয়।

 

৪. ভুল শিক্ষাদান পদ্ধতি

যেখানে শুধু লেকচার-ভিত্তিক পড়ানো হয়, সেসব ক্লাস শিশুদের কাছে একঘেয়ে লাগে। এতে তারা পড়ার প্রতি আগ্রহ হারায়।

 

৫. শেখার বদলে শুধু পড়ানো

অনেক স্কুলেই কেবল পরীক্ষার জন্য শিক্ষার্থীদের প্রস্তুত করতে পড়ানো হয়। বাস্তব জীবনে সেই শেখা প্রয়োগ করার দিকটিতে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। ফলে পড়াশোনা শিশুদের কাছে অর্থহীন মনে হয়।

 

৬. শেখার জটিলতা

ডিসলেক্সিয়া হল এক ধরনের শেখার সমস্যা, যেখানে শিশুদের পড়তে, লিখতে বা বানান করতে অসুবিধা হয়। এটা অলসতা বা বুদ্ধির অভাব নয়—বরং মস্তিষ্ক ভিন্নভাবে কাজ করে বলেই এমন হয়। এরকম হলে শিক্ষক বা অভিভাবক অনেক সময় সন্তানকে “অলস”, “দুর্বল” বা “বোকা” বলে হাল ছেড়ে দেন। এতে শিশুদের মনোবল ভেঙে যায় এবং তারা পড়াশোনা এড়িয়ে চলে।

 

৭. অনুপযুক্ত পরিবেশ

পারিবারিক অশান্তি, বাবা-মায়ের ঝগড়া বা টেলিভিশনের মত ক্রমাগত বিভ্রান্তি পড়াশোনার পরিবেশ নষ্ট করে। strained parent-child সম্পর্কও পড়াশোনার আগ্রহ কমায়।

 

“Strained parent-child relationship” বলতে বোঝায় এমন এক টানাপোড়েনপূর্ণ সম্পর্ক, যেখানে বাবা-মা ও সন্তানের মধ্যে বোঝাপড়া, যোগাযোগ বা আবেগীয় সংযোগ দুর্বল হয়ে যায়। এই অবস্থায় দু’পক্ষের মধ্যে আস্থা কমে যায়, ঝগড়া বা ভু বোঝাবুঝি বেড়ে যায় এবং সন্তান নিজেকে অবহেলিত মনে করতে শুরু করে।

 

এ ধরনের সম্পর্ক অনেক সময় তৈরি হয় বাবা-মায়ের অতিরিক্ত প্রত্যাশা, নিয়মিত সমালোচনা বা সন্তানের অনুভূতিকে গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে। যখন বাবা-মা কেবল ভুলগুলিই তুলে ধরেন, কিন্তু চেষ্টা বা অগ্রগতিকে প্রশংসা করেন না, তখন সন্তান নিজেকে মূল্যহীন মনে করতে শুরু করে।

 

একইভাবে, ব্যস্ততার কারণে সময় না দেওয়া, সন্তানের কথা মন দিয়ে না শোনা বা অন্যদের সঙ্গে ক্রমাগত তুলনা করার অভ্যাসও সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে। এর ফলে শিশুর মনে এক ধরনের চাপ ও হতাশা জন্ম নেয়, যা পড়াশোনার আগ্রহ কমিয়ে দেয় এবং আত্মবিশ্বাস দুর্বল করে ফেলে।

 

পড়াশোনায় আগ্রহ তৈরি করার উপায়

সমস্যা চিহ্নিত করার পর এবার সমাধানের পালা। বাচ্চাকে কি বকাঝকা করবেন? আরো কঠোর হবেন? উত্তরটি হচ্ছে, না। তার বদলে যা করবেন:

 

১. সন্তানকে বুঝুন

সন্তানের সঙ্গে বসে কথা বলুন। তাদের স্কুলের দিন কেমন কাটছে, কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে, কী ভাল লাগছে আর কী বিরক্ত করছে—এসব জানুন। ভাল সামাজিক সম্পর্ক শিশুর শেখার পরিবেশ উন্নত করে।

 

২. শেখার প্রতি মনোযোগ দিন, শুধু পড়ায় নয়

শিশুদের বোঝাতে হবে, শেখা আজীবন চলমান প্রক্রিয়া। শুধু নম্বর নয়, শেখা বাস্তবে কাজে লাগাতে পারলে তবেই তার মূল্য আছে।

 

৩. ‘টেক ওভার’ করবেন না

প্রজেক্ট বা কাজগুলিতে সন্তানকে নিজের মত চিন্তা ও প্রয়োগ করতে দিন। বাবা-মা নিজেরা কাজ করে দেওয়া বা রেডিমেড প্রজেক্ট কিনে দিলে শেখার আসল সুযোগ নষ্ট হয়।

 

৪. শেখার বাধা দূর করুন

শেখার সমস্যা, বিকাশগত বিলম্ব, মনোযোগের সমস্যা ইত্যাদি দ্রুত শনাক্ত করে সমাধান করতে হবে। সাইকোলজিক্যাল অ্যাসেসমেন্ট, থেরাপি, নিয়মিত চোখ ও কানের চেকআপ এ ক্ষেত্রে সহায়ক।

 

৫. বাসার পরিবেশ ঠিক করুন

পারিবারিক সমস্যা বা ঝগড়া সন্তানদের সামনে না করে, কাউন্সেলিংয়ের মাধ্যমে সমাধান খুঁজুন।

 

৬. বিভ্রান্তি কমান

অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম বা গ্যাজেট ব্যবহার কমান। বাইরে খেলার সুযোগ দিন। এতে আত্মবিশ্বাস, আত্মচেতনা ও সামাজিক দক্ষতা বাড়বে, যা শেখার জন্য খুব জরুরি।

 

৭. সঠিক স্কুল বেছে নিন

স্কুল এমন হওয়া প্রয়োজন যেখানে মুক্ত আলোচনা, বিতর্ক ও সমালোচনামূলক চিন্তাকে উৎসাহ দেওয়া হয়। শুধু ফলাফলের বিজ্ঞাপন দেওয়া স্কুল নয়, শেখার পরিবেশ তৈরি করে এমন স্কুল বেছে নিন।

 

৮. প্রেরণা দিন

শুধুমাত্র উপহার বা পুরস্কার দিয়ে প্রেরণা দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। সন্তানের ভেতরে যদি কোনো বিষয়ে আগ্রহ থাকে, সেটিকে উৎসাহিত করুন। যেসব বিষয়ে স্বাভাবিক আগ্রহ নেই, সেখানে বিষয়টির প্রয়োজনীয়তা বুঝিয়ে প্রেরণা দিন।

 

৯. স্পষ্ট লক্ষ্য দিন

পড়াশোনার উদ্দেশ্য অস্পষ্ট হলে শিশুরা বিভ্রান্ত হয়। ধাপে ধাপে লক্ষ্য তৈরি করে দিলে তারা বেশি মনোযোগী হয়।

 

১০. শেখার প্রাসঙ্গিকতা দেখান

শিশুরা প্রায়ই জিজ্ঞেস করে, “এটা শিখে কী লাভ?” তখন তাদের বোঝাতে হবে কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ এবং বাস্তবে কোথায় কাজে লাগে।

 

যা করবেন না

১. পুরস্কার বা শাস্তির ওপর নির্ভর করবেন না। এতে সাময়িক ফল পাওয়া যায়, স্থায়ী নয়।

২. সন্তানকে কখনও ‘বোকা’, ‘অলস’ বা ‘দুর্বল’ বলবেন না। এতে তাদের আত্মসম্মানে আঘাত লাগতে পারে।

৩. অন্যের সঙ্গে তুলনা করবেন না। এতে হীনম্মন্যতা বাড়ে এবং সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

৪. সন্তানের দুর্বলতা প্রকাশ্যে বলবেন না। বরং শিক্ষক বা বিশেষজ্ঞের সাহায্য নিন।

৫. শুধুমাত্র নম্বর বা র‍্যাঙ্ক নিয়ে চাপ দেবেন না। বরং কনসেপ্ট বুঝতে উৎসাহ দিন।

 

বুলিং বা আবেগজনিত সমস্যাকে হালকাভাবে নেবেন না। বরং সহানুভূতিশীল হয়ে সন্তানকে সামাজিক দক্ষতা ও ভাল বন্ধুত্ব গড়ে তুলতে সাহায্য করুন।

 

শেখা শুধু ক্লাসরুমে সীমাবদ্ধ নয়, এটি আজীবনের প্রক্রিয়া। ভাল শেখা মানেই সবসময় ভাল নম্বর নয়। বরং শেখার আনন্দ, কৌতূহল এবং বাস্তবে প্রয়োগ করার ক্ষমতাই শিশুদের মধ্যে শেখার প্রতি ভালবাসা জাগিয়ে তোলে।

 

মুহাম্মদ ছাইফুল্যাহ (সাইফ)

বিএ(অনার্স) ইংলিশ, এমএ(ইংলিশ)

ইংলিশ টিচার,

পরশুরাম পাইলট বালিকা উচ্চবিদ্যালয়

পরশুরাম, ফেনী

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ ইচ্ছাশক্তি
Theme Customized By Shakil IT Park