
লেখকঃ শাহরিয়া সায়হাম
শিক্ষার্থী, গনিত বিভাগ, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রথম দিনের অভিজ্ঞতা:
কলেজ জীবনের প্রথম দিনটা ছিল আমার জন্য অত্যন্ত স্মরণীয়। সেদিন আমাদের নবীন বরণ অনুষ্ঠান হচ্ছিল। বিজ্ঞান বিভাগের ক্লাসে প্রবেশ করতেই শ্রদ্ধেয় শিক্ষকবৃন্দ ও নতুন সহপাঠীদের মুখোমুখি হলাম। সহপাঠীদের মধ্যে দু’জন ছিল আমার পুরনো পরিচিত — জোবায়ের ও সাইফুল। পরিচিত মুখ দেখে মনে কেমন যেন স্বস্তি লাগছিল।
শিক্ষকগণ একে একে বক্তব্য দিতে শুরু করলেন। তাঁরা আমাদের নতুন কলেজ জীবনে স্বাগতম জানালেন এবং পড়াশোনায় মনোযোগী হওয়ার পাশাপাশি কলেজের ইতিহাসের এক ঝলক শোনালেন। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছিলাম।
ঠিক সেই সময়ে ঘটে গেলো মজার এক ঘটনা। একজন স্যার এক ছাত্রকে জিজ্ঞেস করলেন,
— “তোমার চুল এত বড় কেন?”
ছেলেটি উত্তর দিল, “স্যার, আমি মেসির ভক্ত।”
ক্লাসরুম মুহূর্তেই হাসিতে ফেটে পড়ল। স্যারও মুচকি হেসে জানিয়ে দিলেন— “কলেজে লম্বা চুল রাখা যাবে না।”
এরপর আরেকজন ছাত্রকে জিজ্ঞাসা করা হলো— “তুমি কার ভক্ত?”
ছেলেটি সরলভাবে বলে ফেলল, “স্যার, আমি মিয়া খলিফার ভক্ত!”
পুরো ক্লাস তখন অট্টহাসিতে কাঁপছে। আমি ভাবলাম— “কি পাজিরে বাবা!”
অনুষ্ঠান শেষে ফুল হাতে বাসায় ফিরলাম। তখনই আমার জীবনে কলেজ অধ্যায়ের দরজা খুলে গেল।
প্রিয় শিক্ষক ও ক্লাসের স্মৃতি :
শুরু থেকেই বিজ্ঞান বিভাগের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকগণ — শাকিল স্যার (গণিত), রিপন স্যার (রসায়ন) এবং নজরুল স্যার (পদার্থ)— আমাদের পাশে ছিলেন। তাঁরা শুধু ভালো শিক্ষকই ছিলেন না, ছিলেন অসাধারণ মানুষও। কোনো টপিক না বুঝলে ধৈর্য ধরে বুঝিয়ে দিতেন। এক কথায় তাঁরা এরশাদ কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের গর্ব।
প্রথম বিতর্ক প্রতিযোগিতা :
কিছুদিন পর কলেজে আয়োজিত হলো বিতর্ক প্রতিযোগিতা। আমার জীবনের প্রথম বিতর্ক প্রতিযোগিতা। অংশ নিতে অনুপ্রেরণা দিয়েছিলেন সুমন মিত্র স্যার। তিনি বলেছিলেন, “সায়হাম, তুমি পারবে।”
প্রায় ৯০-১০০ জন শিক্ষার্থীর সামনে দাঁড়িয়ে মাইক হাতে বক্তব্য দেওয়া সহজ ছিল না— হাত পা দুটোই কাঁপছিল ভীষণভাবে। তবুও সাহস নিয়ে বলেছিলাম। আর অবশেষে— আমাদের দল জিতে গেল!
এই প্রতিযোগিতা না হলে মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে কথা বলা আমি কখনো শিখতাম না।
ল্যাব ক্লাসের মজার মুহূর্ত :
কেমিস্ট্রি ল্যাবে ঢুকলেই মনে হতো আমি বুঝি কোনো কেমিস্ট। ম্যাডাম পরীক্ষা করতেন, ফলাফল বিশ্লেষণ করতেন, আমরা সবাই বলতাম, “জি ম্যাম, বুঝছি ম্যাম!” — যদিও অর্ধেক বুঝতাম, আর বাকি অর্ধেক মাথার উপর দিয়ে চলে যেত।
বায়োলজি ল্যাবে গিয়ে মনে হতো, আজকেই বুঝি অর্ধেক ডাক্তার হয়ে যাচ্ছি। ডিসেকশন ক্লাসে একদিন এক বন্ধুকে ডেমো দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তার হাত এত কাঁপছিল যে ঠিকমতো কিছুই ধরতে পারছিল না। ম্যাম বললেন, “তোমার হাত এত কাপছে, তুমি ডিসেকশন করবে কীভাবে?” — পুরো ক্লাস হাসিতে মেতে উঠল।
বাংলা ক্লাসের রসাল মুহূর্ত :
বাংলা ক্লাসে সবচেয়ে বেশি মজা হতো হাবিবুর রহমান স্যারের ক্লাসে। তিনি গল্প ও কবিতা এমনভাবে বুঝিয়ে দিতেন যে ক্লাস একদম জমে যেত। একদিন কবিতা পড়ার সময় “রয়ে গেছে ফাঁক” — এই লাইনটি শুনে আমরা সবাই হেসে ফেললাম। স্যারও মজা করে বললেন, “এই ফাঁক, সেই ফাঁক না!”
অন্যদিকে এনামুল স্যারের ক্লাস ছিল একদম গম্ভীর। ওনার ক্লাসে একটাও ফালতু কথা হতো না। স্যারের সামনে সবার আচরণ ছিল খুবই পরিপাটি।
একটি কঠিন ক্লাসের দিন :
একদিন রিপন স্যার কেমিস্ট্রির কোয়ান্টাম নাম্বার পড়াচ্ছিলেন। পরের দিন তিনি সেখান থেকেই প্রশ্ন করেন। আমরা ঠিকমতো দিতে পারিনি। স্যার প্রচণ্ড রেগে গেলেন— কিন্তু শেষে আমাদের ভালোভাবে বুঝিয়ে দিলেন। রাগের মাঝেও তাঁর শেখানোর আগ্রহটা চোখে পড়ার মতো ছিল।
বন্ধুত্ব ও মজার ডাকনাম :
দিন দিন বন্ধু বাড়তে থাকলো। সবার ছিল মজার মজার নিক নেম — যেমন চশমা, চিকনে, স্টাইলিশ বয়, গাইনোকলজিস্ট ইত্যাদি।
মুজিব নামে একজন বন্ধুকে শাকিল স্যার বলেছিলেন, “তোর নামের মধ্যে তাৎপর্য আছে, ভালো করে পড়।” আমরা তাকে মজার ছলে A+ নাঈম বলতাম।
স্টাডি ট্যুরের আগ্রহ ও করোনার ছাপ :
দ্বিতীয় বর্ষে উঠার কিছুদিন পর শুনলাম স্টাডি ট্যুর আয়োজন করা হবে। মনেই ঠিক করেছিলাম— “যেভাবেই হোক আমি যাব।” কিন্তু হঠাৎ করোনা মহামারিতে সবকিছু বদলে গেল। প্রায় ৬-৭ মাস সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। পরে অনলাইন ক্লাস শুরু হলো, যাতে পড়াশোনা ব্যাহত না হয়।
বিদায়ের দিন ও শেষ পরীক্ষা :
দেখতে দেখতে বিদায় ঘণ্টা বেজে উঠলো। স্যারদের সাথে দুই বছরের যে সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল, তা ছিন্ন করা সহজ ছিল না। বিদায়ের দিনে মনটা ভারী হয়ে গিয়েছিল।
পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষার দিন ঘটে গেল মজার এক ঘটনা। রকেটের বেগ নির্ণয়ের অঙ্কে এক বন্ধু উত্তর দিল— “রকেটের বেগ শূন্য!” — আর বলল, “এই বেগে রকেট উড্ডয়ন করেছে।” পুরো ক্লাস তখন হাসিতে ফেটে পড়ল। আজও ওর কথা মনে পড়লে হাসি পেয়ে যায়।
শেষ কথা
জীবনের অনেকগুলো পর্যায়ের মধ্যে কলেজ জীবন নিঃসন্দেহে একটি সোনালি অধ্যায়। বন্ধুত্ব, মজা, ক্লাসের হাসি-ঠাট্টা, শিক্ষকদের পরামর্শ— সবকিছুই আজ স্মৃতিতে গেঁথে আছে।
সবাই এখন নিজের জীবনে ব্যস্ত, কিন্তু আমি আজও সেই দিনগুলোকে মিস করি।
সব বন্ধুদের জন্য অফুরন্ত ভালোবাসা ও দোয়া রইলো —
“জীবনের যুদ্ধে সবাই সফল হয়ে ফিরুক ইনশাআল্লাহ।”