1. admin@ichchashakti.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ১২:৪৬ পূর্বাহ্ন

নিশীথের আঁধারে

  • প্রকাশের সময় : বৃহস্পতিবার, ১৮ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ১০৬ বার প্রতিবেদনটি দেখা হয়েছে

লেখিকা: উম্মি হুরায়েরা বিলু

 

পর্ব:০১

সালাউদ্দিন আইয়ুবির শাসনকাল মিশরের জন্য ছিল উত্তাল এক সময়। ক্রুসেডারদের হুমকি, অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র, আর নাইলের অববাহিকার বিস্তীর্ণ জনপদ—এসবের মাঝে জন্ম নিয়েছে বহু অজানা গল্প। আজ যে গল্পটি বলা হবে, তা সেই সময়কারই এক বিস্মৃত অধ্যায়।

খলিফা আল-আজেদের দেহরক্ষী ফারুক।

কিন্তু ফারুক শুধু দেহরক্ষী ছিল না—সে খ্রিস্টান গুপ্তচরের কাজও করত।

ফারুক তখন সুবাক কেল্লায় অবস্থান করছিল।

সুবাক ছিল ফিলিস্তিনের খ্রিস্টানদের হেডকোয়ার্টার। এখান থেকেই তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে সমস্ত যুদ্ধপরিকল্পনা তৈরি করত।

ওদের নৃশংস অত্যাচারের কারণে বহু মুসলিম পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছিল। কারো ইজ্জত নিরাপদ ছিল না। ফিলিস্তিনের খ্রিস্টানরা ডাকাতের ভূমিকায় মুসলিম কাফেলাগুলো লুন্ঠন করত, মেয়েদের অপহরণ করত। এই অমানবিক হিংসার প্রতিশোধ নিতে এবং ফিলিস্তিনের নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে চাচ্ছিলেন সুলতান আইয়ুবী।

মুসলমানদের প্রথম কিবলা আজ ক্রুসেডারদের দখলে।

আকাশ ভারী হয়ে আছে নির্যাতিত মানুষের বুকফাটা আর্তনাদে।

ইজ্জত-আব্রু লুন্ঠিত নারীদের অশ্রু শুষে নিচ্ছে মরুর বালুকারাশি।

কিন্তু মুসলিম আমীর-ওমরাদের সম্পর্ক সাধারণ মুসলমানদের চেয়ে অভিজাত খ্রিস্টানদের সাথে বেশি।

সমাজের উচ্চস্তর যেন নিঃশব্দে সন্ধি করেছে অত্যাচারীদের সাথে।

ফারুক সেই ভাঙা সময়েরই সন্তান।

আইয়ুবীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে এবং সামরিক সাহায্য সংগ্রহ করতে সে এসেছে সুবাক দুর্গে।

তার সম্মানে রাতে আয়োজন করা হলো নৃত্য-গানের আসর।

নর্তকীদের অধিকাংশই মুসলিম।

অল্প বয়সে অপহরণ করে তাদের গড়ে তোলা হয়েছে পুরুষ-বিনোদনের পণ্যে।

সেই মেয়েদের কেউ হয়তো একসময় নামাজ শিখেছিল মায়ের কাছে, কেউ হয়তো নিজের গ্রামের মাটির গন্ধ ভুলতে পারেনি।

কিন্তু আজ তারা খ্রিস্টান সৈন্যদের আসরে উলঙ্গ দেহে নাচছে।

ফারুক একবারও থেমে ভাবল না—তার নিজের স্বজাতির মেয়েরা এহেন অবস্থায় আছে।

বরং সে বেহিসেবি আনন্দে মদপান করছিল—

তার পাশে আরও দু’জন মুসলিম কমান্ডার।

রাতভর সুর আর সঙ্গীতের মধ্যে ডুবে রইল তারা।

ভোর হলে শুরু হলো আসল বৈঠক।

উপস্থিত ছিলেন পুইলজিনান, কোনার্ড এবং আরও কয়েকজন উচ্চপদস্থ সামরিক অফিসার।

পূর্বরাতে ফারুক তাদের বলেছিল—

“আইয়ুবী সুদানে এক কাফ্রী গোত্রের মন্দির ভেঙে দিয়েছে। পুরোহিতকেও হত্যা করেছে।”

বৈঠকে সে যোগ করল—

“আমি সামরিক সাহায্যের জন্য এসেছি। সুদানে ফিরে ফৌজ গড়ে তুলব।

মিশরের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে আপনাদের সহযোগিতা প্রয়োজন।”

তার গলায় আত্মবিশ্বাস, চোখে ষড়যন্ত্রের আগুন।

ফারুক যেন ভুলেই গেছে—

যে মানুষটির বিরুদ্ধে সে সাহায্য চাইছে, সেই সুলতান আইয়ুবী একজন মুসলিম গভর্নর তারা উভয়ই মুসলিম জাতির সন্তান।

 

কোনার্ড গম্ভীর গলায় বলল,

“এ মুহূর্তে দু’টি বিষয়ের দিকে আমাদের দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।”

চোখ দুটি তার ঠান্ডা, হিসেবি—

মনে হয় যেন প্রতিটি বাক্য আগে থেকেই সে মাপে মাপে তৈরি করে এনেছে।

“প্রথমত,” কোনার্ড বলল,

“যে গোত্রের মন্দির ভাঙা হয়েছে, তাদের প্রতিশোধের আগুন আরও উসকে দিতে হবে।

তাদের মনে এমন ক্ষত তৈরি করতে হবে, যেন তারা বিশ্বাস করে—

আইয়ুবীর পতন ছাড়া তাদের আত্মা শান্তি পাবে না।”

পাশে থাকা সামরিক অফিসাররা মাথা নাড়ল।

এটি ক্রুসেডার কৌশলের পুরোনো পথ—

বিক্ষুব্ধ গোত্রকে অস্ত্র বানানো।

কোনার্ড আবার বলল,

“দ্বিতীয়ত, পুরো সুদানের সব ধর্মের মানুষকে বোঝাতে হবে যে

সুলতান আইয়ুবী ভিন্ন ধর্মের ইবাদতখানা, দেবতা, প্রতিমা—কিছুই সম্মান করে না।

সে যেখানে যায়, সেখানেই অন্য ধর্মের ওপর আঘাত হানে।

তার হাতে কোনো ধর্মই নিরাপদ নয়—এই বার্তাটি ছড়িয়ে দিতে হবে।”

পুইলজিনান মুচকি হাসল।

“ধর্মীয় আবেগ… এটাই তো সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র।”

কোনার্ড মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।

“হ্যাঁ। ধর্মীয় আবেগ সৃষ্টি কর—

তারপর সুদানীদের সেই আবেগ দিয়ে আইয়ুবীর বিরুদ্ধে ব্যবহার করো।

যখন তারা বিশ্বাস করবে যে আইয়ুবী তাদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি,

তখন তারা নিজেরাই অস্ত্র ধরবে আমাদের জন্য।”

ফারুক নীরবে সব শুনছিল।

তার চোখে কোনো অনুশোচনার ছায়া নেই।

বরং এই নীলনকশা তার নিজের বিশ্বাসঘাতক সিদ্ধান্তকে আরও বৈধতা দিচ্ছে।

কিন্তু সে জানে না—

প্রতিটি মিথ্যা, প্রতিটি চক্রান্ত একদিন তার নিজের বুকেই ফিরে আঘাত করবে।

 

বৈঠকের কক্ষে হঠাৎ ঠান্ডা নীরবতা নেমে আসল।

এক খ্রিস্টান কমান্ডার গভীর গলায় বলল,

“মিশরের মুসলমানদেরকেও আমরা সহজেই আইয়ুবীর বিরুদ্ধে দাঁড় করাতে পারব।”

সে ফারুকের দিকে তাকিয়ে একটু হাসল।

“মিস্টার ফারুক, আপনি যদি কিছু মনে না করেন… একটা কথা বলব।

মুসলমানদের মাঝে ধর্মীয় আবেগ সৃষ্টি করে

একজনকে দিয়ে আরেকজনকে হত্যা করানো—

বিশ্বাস করুন, কঠিন কিছু না।”

ঘরটা নিস্তব্ধ হয়ে গেল।

“আমাদের ধর্মে যেভাবে পাদ্রীরা

বান্দা আর খোদার মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে,

ইসলামেও দেখছি অনেকে

মসজিদ দখল করে খোদার এজেন্সি খুলে বসেছে।”

পুইলজিনান হাসল চাপা স্বরে।

কমান্ডার আবার বলল,

“আমাদের সম্পদ আছে। শক্তি আছে।

টাকা দিয়ে নতুন মৌলভী তৈরি করা—এটা আমাদের জন্য কঠিন নয়।

তারপর সেই মৌলভীদের মিশরের মসজিদে বসিয়ে দিতে পারি।

আপনি জানেন কি?

আমাদের খ্রিস্টানদের মধ্যেও এমন অনেকে আছে

যারা কোরআন ও ইসলামের জ্ঞানে পারদর্শী।

চাইলেই মুসলমান সেজে তাদেরই

ইমাম হিসাবে নিয়োগ করা যায়।

সালাউদ্দিন আইয়ুবীর বিরুদ্ধে

মসজিদে সরাসরি কিছু বলার প্রয়োজন নেই।

মৌলভীরা শুধু মানুষের কুসংস্কারের বেড়াজাল টেনে দেবে—

তারপর মানুষ স্বাভাবিকভাবেই

আইয়ুবীর দাপটকে ঘৃণা করবে, ভয় করবে,

দূরে সরে যাবে।”

ফারুক ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বলল,

“এ কাজ এখনই শুরু করা উচিত।

আইয়ুবী মিশরে অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলেছে।

শিশু, কিশোর, যুবক—

সবাই সেখানে ধর্মের সঠিক শিক্ষা পাচ্ছে।

সে আসার আগে মিশরে এমন প্রতিষ্ঠান ছিল না।

লোকজন শুধু খোৎবা শুনত—

যেখানে বেশিরভাগ সময়ই থাকত

রাজা বা খলিফার প্রশংসা।

মানুষের জ্ঞানের চোখ খুলে গেলে

আমাদের কাজ কঠিন হবে।

দেশ শাসন করতে হলে

মানুষকে দৈহিক এবং মানসিকভাবে

পরনির্ভরশীল রাখতে হয়।”

ঠিক তখনই এক কমান্ডার মৃদু হাসল।

“মিস্টার ফারুক,” সে বলল,

“আপনি হয়তো জানেন না—

আপনার দেশে গোপনে অনেকদিন ধরেই

আমাদের কাজ চলছে।

 

পর্ব:০২

সালাউদ্দিন যেদিন

রোম-উপসাগরের তীরে আমাদের পরাজিত করেছিল,

সেদিন থেকেই আমরা পরিকল্পনা বদলেছি।

আমরা সরাসরি যুদ্ধে নামব না—

বরং মানসিকভাবে গোঁড়া মুসলমানদের

বিকলাঙ্গ করে দেব।”

ঘরটা আরও ঠান্ডা হয়ে গেল।

“ভাবুন তো,” কমান্ডার বলল,

“দু’বছর আগে কায়রোতে কয়টা প্রমোদভবন ছিল?

আর এখন?

বিত্তশালী পরিবারের ছেলেমেয়েরা

অশ্লীলতা আর বেহায়াপনায়

ডুবে যাচ্ছে দিনদিন।

আমাদের পাঠানো খ্রিস্টান মেয়েরা

মুসলমানের ছদ্মবেশে ঘুরে বেড়াচ্ছে—

মুসলিম যুবকদের প্রেমের ফাঁদে ফেলে

একজনকে দিয়ে আরেকজনকে হত্যা করাচ্ছে।”

পুইলজিনান গম্ভীর কণ্ঠে যোগ করল,

“কায়রোতে এখন

আকর্ষণীয় জুয়ার আখড়া গড়ে উঠেছে।

আর শুনুন—

দুটি মসজিদে আছে আমাদের পাঠানো ইমাম।

ওরা ইসলামের রূপ বদলে দিচ্ছে।

জিহাদের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করছে

পুরোপুরি উল্টোভাবে।”

ফারুক দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল।

ঘরে তখন ষড়যন্ত্রের গন্ধ ঘন হয়ে উঠছে—

এ যেন একটি সতর্কবার্তা,

একটি ঘোষণা,

একটি আসন্ন ঝড়ের আগমনী সুর।

 

কোনার্ডের কণ্ঠে গা ছমছমে এক প্রশান্তি।

“মিশরের ভেতর এখন আলেমের ছদ্মবেশে আছে আমাদের অনেক লোক। ওরা যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রচার করছে। মুসলমানদের দৃষ্টি এমনভাবে ঘুরিয়ে দিচ্ছে যে বন্ধু আর শত্রুর সীমারেখাই পাল্টে যাচ্ছে।”

সে ধীরে ধীরে ঘরটিতে চোখ বুলিয়ে বলল—

“ক’ বছর পরে দেখবেন—ওরা নিজেদের মুসলমান বলে গর্ব করলেও মনমানসিকতা হবে খ্রিষ্টান সভ্যতার প্রতিচ্ছবি। কথা বলবে আমাদের ভাষায়, চিন্তা করবে আমাদের মস্তিষ্ক দিয়ে।”

ফারুক জানালার দিকে তাকিয়ে বলল—

“সালাউদ্দীন আইয়ুবীর গোয়েন্দারা অত্যন্ত সতর্ক। যদি গোয়েন্দা প্রধান আলীকে সরানো যায়, আইয়ুবী অন্ধ-বধির হয়ে যাবে।”

কোনার্ড হঠাৎ তীব্রভাবে হেসে উঠল।

“এর মানে আপনি নিজে কিছুই করতে পারছেন না! একজন সরকারি কর্মচারীকেও হত্যা করতে পারছেন না! এতটাই বুদ্ধিহীন হলে আমাদের লোকদেরও বিপদে ফেলবেন। তারা ধরা পড়বে—অহেতুক নষ্ট হবে আমাদের সম্পদ।”

ফারুক দাঁত চেপে বলল—

“ঠিক আছে, এ কাজ আমি নিজেই করব। ঘাতকদলের সাথে কথা হয়েছে—ওরা আইয়ুবীকে হত্যার জন্য প্রস্তুত।”

কোনার্ড এবার গম্ভীর।

“আপনি সুদানের দিক থেকে মিশর সীমান্তে অশান্তি সৃষ্টি করবেন। দেশের ভেতরে আমরা ওদের সভ্যতা–সংস্কৃতি ভেঙে ফেলার কাজ চালাবো। আরবের কয়েকজন আমীর-ওমরাকে আমরা কিনে নিয়েছি। মুসলমানদের মধ্যে এখন টিকে আছে মাত্র দু’জন—নূরুদ্দীন জংগী আর সালাউদ্দীন আইয়ুবী। ওদের সরাতে পারলে পৃথিবী থেকে ইসলামের সূর্যই ডুবে যাবে।”

সে আরও ঝুঁকে বলল—

“আপনাদের অটল থাকতে হবে। এরপর মিশর হবে আপনাদের।”

দীর্ঘক্ষণ ধরে চলল আলোচনা।

নানান পথে, নানান মুখোশে, কীভাবে আইয়ুবীকে প্রতিহত করা যায়—তাই নিয়ে আঁকা হলো অন্ধকার নকশা।

শেষে বিদায়ের আগে ফারুকের হাতে তুলে দেওয়া হলো তিনজন অনিন্দ্য সুন্দরী যুবতী।

সঙ্গে প্রচুর স্বর্ণমুদ্রা।

কায়রোর দুই সম্মানিত ব্যক্তির ঠিকানা।

তাদের একজন ফয়জুল ফাতেমী—যে জানে মেয়েদের কোথায়, কীভাবে ব্যবহার করতে হয়।

মেয়েরাও জানে তাদের ভূমিকা—

তারা ভাষাজ্ঞানী, ছদ্মবেশে পারদর্শী, আর ঠিক যে জন্য পাঠানো হয়েছে, সে কাজেই সিদ্ধহস্ত।

ফারুক বিদায় নিল—

তিন যুবতী আর দশ সৈনিক নিয়ে।

গন্তব্য—আংগুক গোত্র।

এই গোত্রের দেবতা ও মন্দির ভেঙে দিয়েছিলেন আইয়ুবী।

ফারুক যখন ধরা পড়ে যায় ক্রুসেডারদের গুপ্তচর হিসেবে, তখন মিশর থেকে পালিয়ে এখানে আশ্রয় নিয়েছিল।

জংগী কাফেরদের নিয়ে মিশর আক্রমণ করেছিল—ব্যর্থ হয়েছিল।

গোত্রের বেশির ভাগই মারা গেছে।

তবু পাহাড়ঘেরা এই নির্জন স্থানটাকে এখনও ওরা ‘দেবতার আশ্রম’ মনে করে—

ভয়ে সেখানে যায় না সাধারণ কেউ।

আজ সেখানে প্রবেশ করল গোত্রের ধর্মীয় গুরু।

সঙ্গে আরও তিনজন বিশ্বস্ত দেহরক্ষী—

নিঃশব্দে নিজেরাই নিজেদের দেবতার পুরোহিত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করল।

দেবতার আশ্রমে আসে–যায় এখন এই চারজনই।

তাদের গোপন কথোপকথনে

নির্মিত হচ্ছে আরেক অন্ধকার পরিকল্পনা।

পাহাড়ঘেরা এক নিভৃত উপত্যকায় সাময়িক আস্তানা গেড়েছিল ফারুক। সেখান থেকেই একদিন ফিলিস্তিনের দিকেই রওনা হলো সে—তিন যুবতী আর দশ সৈনিককে নিয়ে।

আংগুক গোত্র এদিকে আতঙ্কে অধীর। দেবতার উদ্দেশ্যে বলি দেওয়া হয়নি বহুদিন, পুরোহিত নিহত, ভেঙে ফেলা হয়েছে দেবতার বিগ্রহ—সবকিছু যেন অশুভ সংকেত। দেবতার অপমানের প্রতিশোধ নিতে গিয়ে যে অসংখ্য যুবক মারা গেছে, তাদের শোকেও ঘরে ঘরে কান্নার রোল।

কিছু লোক ভাবতে লাগল—

যে শক্তি দেবতার আশ্রম ভেঙে দিতে পারে, সে নিশ্চয়ই বড় দেবতা!

পুরোহিত তাদের ভয়-আতঙ্ক দেখেই বললেন,

“দেবতাদের কুমীর ক্ষুধার্ত। ওদের জন্য খাদ্যের ব্যবস্থা করো।”

গোত্রের কাফ্রীরা উট, ছাগল, ভেড়া পাঠিয়ে দিল। কিন্তু মানুষের মন থেকে দেবতার রোষের ভয় কাটল না।

এক রাতে গোত্রবাসীকে পাহাড়ের বাইরে সমবেত করলেন পুরোহিত। কণ্ঠ ভার করে বললেন—

“আমি দেবতাদের সাথে কথা বলেছি। সময়মতো বলি না দেওয়ায় এই বিপদ এসেছে। দেবতারা বলেছেন—একসাথে দু’জন ফর্সা মেয়েকে বলি দিলে তবেই দুর্যোগ দূর হবে। তা না হলে দেবতা কাউকে ছাড়বে না।”

গোত্রের কয়েকজন যুবক তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে গেল।

বলল, “মিশর থেকে দু’জন মেয়ে এনে দেব আমরা—মুসলমান বা ফিরিঙ্গি, যেই হোক।”

ঠিক এই সময়েই দীর্ঘ বিপদসংকুল পথ পাড়ি দিয়ে ফারুক পৌঁছাল দেবতার আশ্রম পাহাড়ে। সীমান্তে সুলতানের টহলদার সৈন্য থাকায় তাকে পথ বদলাতে হয়েছে বহুবার।

সঙ্গে খাবার, পানি বোঝাই উট—আর ঘোড়ায় চড়া ক্লান্ত দশ সৈন্য।

আসার একদিন আগে পুরোহিতের পক্ষ থেকে ঘোষণা গেছে—“দ্বৈত বলি দিতেই হবে।”

ফারুক প্রথমেই দেখা করলো পুরোহিতের সাথে। তিনটি  সুন্দরী যুবতী  দেখে পুরোহিতের চোখ খুশীতে ঝলমল করে উঠলো। এমন মেয়েই বলীর জন্য উপযুক্ত।

মেয়েদের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলো পুরোহিত। ফারুক বললো,এদেরকে বিশেষ উদ্দেশ্যে আনা হয়েছে।

তিনদিকে পাহাড় ঘেরা এক মনোরম জায়গায় মেয়েদের নিয়ে গেলো ফারুক।তাঁবু টানালো।সুযোগ পেলেই ওদেরকে কায়রো পাঠিয়ে দেবে। পথে কোনো ঝামেলা হয়নি,নিরাপদেই পৌঁছতে পেরেছে,এ খুশীতে রাতে উৎসব জমালো।জমলো মদের আসর।খ্রিস্টান সৈন্যরাও অংশ নিলো এতে।পান করলো মেয়েরাও।

মধ্যরাত,ঘুমিয়ে আছে সবাই। একটা মেয়ের হাত ধরে নিজের তাঁবুর দিকে যেতে চাইল ফারুক।উদ্দেশ্য বুঝে ফেললো মেয়েটি।বেঁকে বসলো।বললো,আমি বাজে মেয়ে নই।ক্রুশের দায়িত্ব পালন করার জন্য এসেছি।আপনার সাথে মদপান  করতে পারি, কিন্তু বাজে প্রস্তাবেসাড়া দিতে পারি না।

ফারুক হেসে ওকে নিজের দিকে আকর্ষণ করলো,হাত ছাড়িয়ে নিল মেয়েটা।ফারুক বাড়াবাড়ি করতেই ও হাত ছাড়িয়ে এক দৌড়ে সঙ্গী মেয়েদের কাছে ছুটে গেলো।তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলো অন্য দু’জন।ওরা ফারুককে বুঝিয়ে বললো,বিশেষ উদ্দেশ্যে ওদের আসা।ফারুক যেনো ওদের খারাপ মেয়ে মনে না করে।

ক্ষেপে গেলো ফারুক। বললো,তোমরা কেমন সতী জানি।তোমাদের পেশাই তো হলো পুরুষ তোষণ।

দায়িত্বের খাতিরে সবই করি আমরা।কিন্তু আমরা পেশাদার বাজে মেয়ে নই।

ফারুক কোনো কথা শুনতে নারাজ।তাকে বুঝাত না পেরে মেয়েরা বললো,আমাদের সাথে দশজন সৈন্য আছে।ওরা এসেছে আমাদের হেফাজতের জন্য। কাল ওদের ফিরে যাবার কথা।কিন্তু আমরা প্রয়োজন মনে করলে ওদের রেখে দিতে পারি বা বাড়াবাড়ি করলে আমরা ফিরেও যেতে পারি।

হুমকিটা ঠিকমতই কাজে লাগল,চুপ মেরে গেলো ফারুক।কিন্তু চেহারা দেখে মনে হলো সে সহজে মেয়েদের ছাড়বে না।

 

পর্ব:০৩

পরদিন সকালেই দশজন সৈন্যকে বিদায় করে দিল ফারুক।

দিন গড়িয়ে গেল।

সন্ধ্যায় তিন যুবতীর সাথে গল্পে মেতে আছে এমন সময় পুরোহিত চারজন কাফ্রী পাহারাদার নিয়ে হাজির হলো।

গম্ভীর, ভারী কণ্ঠে বলল,

“আমাদের দেবতা অসন্তুষ্ট। তিনি দু’জন ফিরিঙ্গি অথবা মুসলমান মেয়ের রক্ত চেয়েছেন। এ মেয়েরা বলির উপযোগী। এখান থেকে দু’জন মেয়েকে আমাদের দিতে হবে।”

বজ্রাঘাতে ঘায়েলের মতো স্তব্ধ হয়ে গেল ফারুক।

“ওদের বলির জন্য আনা হয়নি,” সে বলল, “ওদের দিয়ে অন্য কাজ করাবো। যারা তোমাদের অপমান করেছে, তাদের শাস্তি দেব ওদের সাহায্যে।”

পুরোহিত ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে বলল,

“মিথ্যে বলছো। তুমি ভোগের জন্যই এদের এনেছো। দেবতার নির্দেশ অমান্য করা যাবে না। দু’জনকে অবশ্যই বলি দিতে হবে।”

ফারুক যুক্তি দিল, ব্যাখ্যা করল, নানা কথা বলল—

কিন্তু পুরোহিতের মনে যেন দেবতার ভয়ের কুয়াশা জমে আছে। সে কিছুই শুনতে রাজি নয়।

অবশেষে কাছে এসে দু’জন মেয়ের মাথায় হাত রেখে বলল,

“আংগুকের মুক্তি—এই দুই কন্যার রক্তে।”

তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে সতর্কবার্তা দিল,

“মেয়েদের নিয়ে পালাতে যেয়ো না। তুমি যেখানে যাবে—আমাদের ছেলেরা খুঁজে নেবে।”

পুরোহিত চলে যেতেই তিন যুবতী ফারুককে ঘিরে দাঁড়াল। ওরা ভাষা বুঝতে পারেনি, তাই জানতে চাইল—

“কাফ্রীটা কি বলল?”

ফারুক দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,

“ওরা দু’জনকে বলি দিতে চায়… দেবতার নামে।”

এক মেয়ে কেঁপে উঠে জিজ্ঞেস করল, “বলি মানে কী?”

ফারুক বলল,

“প্রতি পাঁচ বছরে পূর্ণিমার রাতে এক সুন্দরী মেয়ের মাথা কেটে বলি দেওয়া হয়। পরে মাথাটা রোদে শুকানো হয় আর দেহটা ফেলে দেওয়া হয় ঝিলে—যেখানে অনেক কুমীর আছে।”

মেয়েদের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।

ফারুক আরও বলল,

“খলিফা আল-আজাদের হেরেম থেকেও একবার মেয়ে তুলে এনেছিল ওরা। দোষ চাপানো হয়েছিল আইয়ুবীর ওপর। সেই অপহরণের খোঁজ করতে গিয়েই আইয়ুবী এই মন্দিরের কথা জানতে পারে এবং মন্দির ভেঙে দেয়। তখন বলি সম্পূর্ণ হয়নি—সেজন্য দেবতা নাকি ভীষণ রুষ্ট। তাই এবার একসাথে দু’জনকে বলি দেবে।”

স্তব্ধ নীরবতা।

তিন যুবতীর চোখে আতঙ্কের ঝড়।

“আমাদের বাঁচানোর কোনো উপায়?”

একজন ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল।

ফারুক বলল,

“অনেক বুঝিয়েছি—কোনো লাভ নেই। পুরোহিত বলেছে, আমি বাধা দিলে আমাকে হত্যা করে কুমীরকে খাওয়াবে। ওদের দাবি—ওরা আমার ফৌজে যোগ দেবে; তার আগে দেবতাকে তুষ্ট করতে হবে।”

মেয়েরা একে অপরের দিকে তাকাল।

ওদের মন ভরসা পেল না।

গত রাতেই তারা বুঝে গেছে—ফারুক ওদের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তা করছে না।

সে শুধু নিজের লাভটাই দেখছে।

তারা তাঁবুতে ফিরে এলো।

চুপচাপ বসে রইল তিনজন।

ওরা কাউকে খুশি করতে এখানে আসেনি—না দেবতা, না ফারুক।

জাতির খেদমতের প্রশিক্ষণ তারা পেয়েছে বহু বছর ধরে।

এভাবে উদ্দেশ্যহীন, অসহায় মৃত্যুর জন্য নয়।

তারা সিদ্ধান্ত নিল—

পালিয়ে যাবে।

ফিলিস্তিন পর্যন্ত পথ দীর্ঘ ও বিপজ্জনক—তবু মরুভূমির বুকে মৃত্যু অপেক্ষা করলেও স্বাধীনতার চেষ্টা করতে ওরা পিছপা নয়।

দিন কাটতে লাগল।

মেয়েরা দিনের বেলায় ঘোড়ার আস্তাবল দেখল, কোন পথ দিয়ে এসেছে—সব খুঁটিয়ে মনে রাখল।

পুরোহিতও সেদিন এসে ফারুককে কিছু বলে গেল—তার মুখ দেখে বোঝা যায় সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত।

ফারুক এসে বলল,

“পুরোহিত আগামীকাল তোমাদের নিয়ে যাবে। বাধা দিলে আমাকে মেরে কুমীরকে খাওয়াবে বলেছে।”

মেয়েরা কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না।

পালানোর সিদ্ধান্তের কথা ওরা কাউকে জানাল না।

পরদিন বিকেলে সিনথিয়া—মেয়েদের একজন—হাসিমুখে বলল,

“মরুভূমিতে এত সবুজ কোথা থেকে এসেছে? পরিবেশটা খুব সুন্দর… আমাদের একটু ঘুরিয়ে দেখাবেন?”

ফারুক নির্দ্বিধায় রাজি হয়ে গেল।

ওদের নিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেল ঝিলের ধারে।

সেখানে পাঁচটি বিশাল কুমীর রোদে গা এলিয়ে শুয়ে আছে।

দৃশ্য দেখে তিনজনই চিৎকার করে উঠল।

ফারুক বলল,

“বলি দেওয়া মেয়েদের দেহ ওরা খায়। গোত্রের অপরাধীকেও এখানে ফেলে দেওয়া হয়।”

এ দৃশ্য তাদের মনে পালানোর সংকল্প আরও পোক্ত করে দিল।

ফারুকের সঙ্গে ঘুরে ঘুরে তারা পলায়নের পথ নিখুঁতভাবে মনে রাখল।

এদিকে পুরোহিত আশ্রম ছেড়ে গাঁয়ে গিয়ে ডাক দিলেন সবাইকে।

উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন—

“চার রাত পরে ভরা পূর্ণিমায় দেবতা দু’টি ফিরিঙ্গি মেয়ে পাবেন বলিতে! বলি শেষে মন্দির নতুন করে গড়ে উঠবে। তারপর দেবতার অপমানকারীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়া হবে।”

গ্রাম জুড়ে উন্মত্ত উল্লাস।

আর সেই রাতেই—

তিন যুবতী নিয়ে এলো তাদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা।

মধ্যরাতে ফারুককে দিল মদের গ্লাস।

একটির পর একটি গ্লাস শেষ হচ্ছে—

ধীরে ধীরে ফারুক বেহুঁশ হয়ে পড়ল।

ভোরের আগে জেগে ওঠার কোনো সম্ভাবনা নেই।

মেয়েরা নিজেদের তাঁবুতে ফিরে এলো।

নিঃশব্দে প্রস্তুতি নিল যাত্রার।

ঘোড়ার জিন কষল, সামান্য রসদ বেঁধে নিল।

তারপর পায়ে পায়ে তাবুর বাইরে বেরিয়ে এল।

কাফ্রী পাহারাদাররা খানিক দূরে নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে।

ওরা জানত—এখান থেকে পালানোর সাহস কারো নেই।

পালালেও মরুভূমির বালুকারাশি গিলে ফেলবে।

তাদের ভুল ভেঙে দিল তিন নারী।

শ্যামল-সবুজ সেই ভয়ংকর কারাগার ছেড়ে

রাতের অন্ধকারে

ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে গেল তারা—

ফিলিস্তিনের উদ্দেশে।

যে পথে ফারুক তাদের এনেছিল, সেই পথ ধরেই তিন যুবতী ফিরে যাচ্ছিল।

ওরা ছিল মেধাবী, বুদ্ধিমতী—আর সামরিক প্রশিক্ষণে দক্ষ।

তাই ওদের মনে হয়েছিল, কাজটা কঠিন হলেও অসম্ভব নয়।

কিন্তু ওরা জানতো না—

ঊষর মরুভূমির সীমাহীন বিস্তারে

ধু-ধু বালুর সমুদ্রে

হারিয়ে যেতে সময় লাগে না।

আদিগন্ত বালির রাজ্যে

সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধাও প্রতারিত হয়,

দিকভ্রান্ত হয়ে ঘুরপাক খায় অদৃশ্য সীমানায়।

সেজন্যই লোকেরা মরুভূমি পাড়ি দেয় দলবদ্ধ হয়ে।

কারণ এই বিপদের বিরুদ্ধে লড়ার মতো কোনো অস্ত্রই ওদের হাতে ছিল না।

নিশীথ রাতের গভীর নীরবতা মাড়িয়ে

তারা কিছু দূর ধীরে ধীরে এগোল।

তারপর হঠাৎ ঘোড়াগুলোকে ছুটিয়ে দিল পূর্ণ গতিতে।

রাতের শীতল মরু-বাতাসকে চিরে

যতদূর সম্ভব দ্রুত সরে গেল তারা—

ধরা পড়ার ভয় যতটা সম্ভব পেছনে ফেলে।

অনেক দূর যেতেই গতি কমালো।

রাতে তখন কোণাভাবে হেলে পড়ছে।

ধরা পড়ার আশঙ্কা অনেকটাই কমে এসেছে।

বাকিটা পথ ওরা ঢিলেঢালা ছন্দে এগিয়ে চললো।

ভোর হলে তারা থামলো একটু।

সূর্য উঠতেই দেখা গেল—

চারপাশে শুধু বালিয়াড়ি।

দূরে ধূসর রঙের উঁচু উঁচু পাহাড়।

কোনো দিক নেই, কোনো পথ নেই—

যেদিক চোখ যায় কেবল অন্তহীন বালু আর বালু।

ওরা সূর্যের অবস্থান দেখে

উত্তরমুখে যাত্রা ঠিক করল।

ঘোড়াগুলো স্পষ্টই তৃষ্ণায় কাতর।

পিঠে বাঁধা মশকের পানি তাদের হয়তো

আর এক দিনের বেশি টিকবে না।

তিন মেয়েই চারদিকে তাকাতে লাগল—

কোথাও কি কোনো খেজুর বাগান আছে?

কোথাও কি কোনো ওয়েসিস মিলতে পারে?

আকাশে সূর্য উঠতে উঠতে

তাপ যেন আগুন হয়ে নেমে এলো।

বালু গরম লোহার মতো জ্বলছে।

কোনো ছায়া নেই,

খেজুর গাছ নেই,

পানি তো দূরের কথা—

সিক্ততার কোনো চিহ্নও নেই।

এদিকে প্রায় মাথার ওপরে উঠে এসেছে সূর্য।

ওই সময়ও ফারুকের ঘুম ভাঙেনি।

তিনজন কাফ্রীকে নিয়ে তাঁবুতে এসে হাজির হলো পুরোহিত।

ফারুককে দড়াম করে জাগিয়ে তুলল।

“মেয়েরা কোথায়?”—

পুরোহিতের চোখে ক্রোধের লাল আভা।

“মেয়ে দুটো আমার হাতে দাও,”

সে কঠিন কণ্ঠে বলল,

“এমন মূল্যবান মেয়েগুলো নষ্ট করার সাহস কোরো না।”

ফারুক বলার চেষ্টা করল—

“ওদের দিয়ে আরও দরকারি কাজ—”

পুরোহিত চেঁচিয়ে উঠল—

“অনর্থক জ্ঞান দিও না!

দুটো মেয়েকে এখনই আমার হাতে তুলে দাও!”

বাধ্য হয়ে ফারুক তাঁবু থেকে বেরিয়ে এসে ডাক দিল,

“এই! তোমরা কেউ আছো?”

কোনো সাড়া নেই।

সে মেয়েদের তাঁবুর দিকে এগোল।

তাঁবুর পর্দা সরিয়ে ভেতরে উঁকি দিল—

তারপর হঠাৎ মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।

তাঁবুর ভেতর শূন্য।

চুল্লির ঠান্ডা ছাই ছাড়া কিছুই নেই।

ঘোড়াগুলোও নেই।

মেয়েরা উধাও।

 

 

পর্ব:০৪

ফারুক অসহায় গলায় বলল,

“ওরা তোমাদের ভয়ে পালিয়ে গেছে।

তোমরাই আমার মহামূল্যবান মেয়েগুলোকে তাড়িয়ে দিলে।”

পুরোহিতের চোখে ঝলসে উঠল ক্রোধ।

তিনি সংগীদের দিকে তাকিয়ে গর্জে উঠলেন—

“ওকে বেঁধে ফেলো!

আবারও আংগুকের দেবতাদের অসন্তুষ্ট করেছে এই বিশ্বাসঘাতক।”

পুরোহিতের লোকেরা মুহূর্তেই ফারুকের দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ল।

তার হাত পিছমোড়া করে শক্ত করে বেঁধে ফেলল এক বিশাল শিকড়ে।

তার অস্ত্র কেড়ে নিল।

হুমকি ছুঁড়ে দিল—

“তাবু থেকে বেরুলোেই মেরে ফেলব।”

এদিকে পুরোহিত দ্রুত আদেশ দিল—

“গাঁয়ে যাও।

দ্রুত ঘোড়া ছুটাতে পারে এমন যুবকদের নিয়ে এসো।

মেয়েরা বেশি দূরে যেতে পারেনি।

ট্রেইল ধরে এগোলে ধরে ফেলা কঠিন হবে না।”

কিছুক্ষণের মধ্যেই দু’জন দ্রুতগামী অশ্বারোহী মরুর পথে ছুটে গেল।

বালুর ওপর এখনো ঘোড়ার ক্ষুরের চিহ্ন স্পষ্ট—

দিক খুঁজে পেতে কষ্ট হলো না।

ওরা মরু-সন্তান—

কঠিন কষ্ট আর বিপদের মধ্যেই জন্ম তাদের,

মরুর দ্রোহী বাতাসই তাদের শিক্ষক।

তারা ধুলো ঝড় উঠিয়ে

সেই চিহ্ন ধরে ছুটল প্রবল গতিতে।

কিন্তু আট-দশ ঘণ্টা পুরোনো ট্রেইল

বালুর ঢেউ অনেকটাই মুছে দিয়েছে।

তবুও অভিজ্ঞ দৃষ্টি দিয়ে

ওরা দিগন্তজোড়া বালিতে মেয়েদের চলার দিক অনুমান করল।

চার ঘণ্টা একটানা ছুটে হঠাৎ তারা থমকে দাঁড়াল।

দূর আকাশে বালির ধূসর-লাল পর্দা ধীরে ধীরে উঠছে।

দু’জনের চোখে আতঙ্ক জমে গেল।

সাইমুম।

মরুর মারণঝড়।

ঘোড়ার লাগাম ঘুরিয়ে

তারা জীবন বাঁচাতে বিপরীত দিকে ছুটে পালাতে লাগল।

কারণ সাইমুমের নিষ্ঠুরতা তারা ভালো করেই জানে—

কে দাঁড়ায়, কে পড়ে থাকে—

ঝড় কাউকে ক্ষমা করে না।

সামনে বাঁচার মতো আশ্রয় নেই—

কোনো খাঁজ, কোনো পাথুরে পাহাড় নয়,

শুধুই খোলা মৃত্যু।

ঝড় এগিয়ে এলো দেবতার পার্বত্য আশ্রমের দিকেও।

গাছপালা ভেঙে পড়ছে,

কুমীরগুলো আশ্রয় নিচ্ছে গর্তে।

পুরোহিত হাঁটু গেড়ে বসে চিৎকার করে বলছেন—

“হে আংগুকের দেবতা!

তোমার অভিশাপ তুলে নাও!

খুব শিগগিরই দেব তোমার প্রাপ্য দু’টি সুন্দরী বলি!”

তিনি বিশ্বাস করলেন—

ঝড় হচ্ছে দেবতার ক্রোধ।

মেয়েরা—

তিনজনই তখন ঝড়ের মুখোমুখি।

দিগন্তজোড়া মরুর বুকে

ওদের সামনে নেই কোনো আশ্রয়—

না ছায়া, না পাহাড়, না পানি।

ঝড়ের ধাক্কায় আতঙ্কিত ঘোড়াগুলো

এলোপাথাড়ি ছুটতে লাগল।

তবু সামরিক প্রশিক্ষণ পাওয়া ঘোড়া—

ভয়ংকর পরিস্থিতিতেও তিনটিকে আলাদা হতে দেয়নি।

হঠাৎ একটি শুকনো শাখা প্রচণ্ড বেগে এসে

মেয়েদের আঘাত করে গেল।

ঘোড়াও কাহিল, আরোহীরাও বিধ্বস্ত।

তৃষ্ণায় পুড়ছে ঘোড়াগুলো—

রাত থেকে ছুটছে একনাগাড়ে।

হঠাৎ—

একটি ঘোড়া উপুর হয়ে ঢলে পড়ে।

আরোহী মেয়েটা ছিটকে পড়ে তার নিচে।

এক মুহূর্তেই বোঝা গেল—

সে আর বাঁচবে না।

বাকি দু’টি ঘোড়া কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে

দ্রুত থামানোর চেষ্টা করল মেয়েরা।

কিন্তু তীব্র ঝাঁকুনিতে

দ্বিতীয় মেয়েটা কাত হয়ে পড়ে গেল।

তার পা আটকে গেল পাদানিতে।

ঘোড়া দৌড় থামালেও হাঁটা থামাল না—

মেয়েটা মাটির সাথে হিঁচড়ে যেতে লাগল।

তৃতীয় মেয়েটা—

সিনথিয়া—

বাঁচানোর জন্য কিছুই করতে পারছে না।

তার নিজের ঘোড়াও নিয়ন্ত্রণে নেই।

হাওয়ার গর্জন, ধুলো, আর বান্ধবীদের

হৃদয়বিদারক চিৎকারই শুধু কানে বাজছে।

চিৎকার চলল অনেকক্ষণ—

তারপর ধীরে ধীরে ক্ষীণ হয়ে গেল।

মরুর অন্ধকার ঘনিয়ে এলে

সিনথিয়া দেখল আর কিছুই দেখা যাচ্ছে না—

না ঘোড়া,

না বান্ধবীর দেহ।

সে এখন একা।

সম্পূর্ণ একা।

ভয়ে, বেদনায় ভেঙে পড়ে

সিনথিয়া দু’হাত আকাশের দিকে তুলে

চিৎকার করে কাঁদতে লাগল—

“হে আকাশের মালিক!

হে মহান প্রভু!

আমাকে ক্ষমা করো!

আমি পাপী… পাপের সাগরে ডুবে আছি।

শৈশব থেকে পাপের মধ্যেই বড় হয়েছি…”

কথাগুলো বেরোতে লাগল উন্মাদনার মতো।

“ওরা বলেছে—

এই রূপ, এই দেহ কাজে লাগিয়ে

মানুষকে ফাঁদে ফেলতে,

প্রতারিত করতে,

হত্যা করাতে—

এটাই নাকি ক্রুশের পবিত্র দায়িত্ব!

এই নাকি আমাকে স্বর্গ দেবে!”

সে কাঁদছে, কাঁপছে,

মনে হচ্ছে—চেতনা কোথায় যেন হারিয়ে যাচ্ছে।

“হে প্রভু…

যে ধর্ম সত্য—

আমাকে তার নিদর্শন দেখাও।

মরার আগে তোমার মহিমা দেখতে চাই।”

তার বুক ভরে উঠলো গভীর অনুশোচনায়।

নিজেকে মনে হলো—

কেউ না থাকা এক অনাথ মেয়ে,

অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া এক দেহ,

যাকে পৃথিবী শুধুই ভোগের সামগ্রী ভেবেছে।

“আমি এখন মরতে চাই না… না…

হে খোদা, আমাকে সাহায্য করো…”

ঘোড়াটি ধীরে ধীরে থেমে গেল।

সিনথিয়া মাথা তুলে আকাশের দিকে তাকাল—

তার অতীত জীবনের সব দুঃখ, অপরাধবোধ,

আর একা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা

তার বুকের ভেতর জমাট হয়ে উঠল।

এক যুবতী তার হারানো অতীতে ফিরে যেতে চাইছিল।

কিন্তু সেখানে তার জন্য কিছুই ছিল না—

না কোনো মা, না কোনো বাবা,

না কোনো আপন ভাইবোন।

তার স্মৃতিতে কেবল একটি কথাই স্পষ্ট ছিল—

খ্রিস্টানরাই তাকে লালন-পালন করেছে।

তারাই তাকে এই পথ দেখিয়েছে।

আর সে—

ছিল মাত্র একটি মনকাড়া প্রতারণার ছদ্মবেশ।

নিজেকে ঘৃণা হলো তার।

মনে হলো—একটি পাপের পুতুল ছাড়া আর কিছুই নয় সে।

তার বুক ভরে উঠল গভীর অনুতাপে।

সে ক্ষমা চাইছিল…

মুক্তি চাইছিল…

আর সেই অপরাধবোধের ভারে তন্দ্রা ধীরে ধীরে তাকে গ্রাস করে নিল।

ঝড় থেমে গেছে।

মরুভূমির অন্ধকার নেমে আসে ধীরে ধীরে।

অসীম বালুতট জুড়ে নেমে এসেছে নিস্তব্ধতা।

তার ক্লান্ত ঘোড়াটি ধীরে ধীরে হাঁটছিল,

আর তার পিঠে অজ্ঞান হয়ে পড়ে ছিল

সেই অসহায়, পথহারা মেয়েটি।

সীমান্ত পাহারার জন্য

বিভিন্ন স্থানে চেকপোস্ট বসিয়েছিলেন সুলতান আইয়ুবী।

মিশর–সুদান সীমান্তের চার-পাঁচ মাইল ভেতরে

একটি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে ছিল

সীমান্ত বাহিনীর হেডকোয়ার্টার।

সেখানে টানা তিন প্লাটুন সৈন্যের অবস্থান।

তাঁবু খাঁটিয়ে থাকা,

এক চেকপোস্ট থেকে আরেকটিতে টহল দেওয়া—

এটাই ছিল তাদের প্রতিদিনের জীবন।

আজকের ভয়ংকর ঝড়ে

তাঁবুগুলোর ক্ষতি হয়েছে বেশ।

উট ও ঘোড়া সামলাতে ব্যস্ত ছিল সৈনিকরা।

ঝড় থামার পর তারা ক্ষতিগ্রস্ত তাঁবুগুলো মেরামত করতে লাগল।

এই বাহিনীর কমান্ডার—

তুর্কি অধিবাসী সামির মাহতীর।

লম্বা, বলিষ্ঠ দেহ,

ফর্সা আর তীক্ষ্ণ দৃষ্টি—

এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।

ঝড় থামতেই তিনি তাঁবু থেকে বেরিয়ে এলেন।

উড়তে থাকা মালপত্র আর প্রাণীগুলোকে দেখে

তিনি ক্ষয়ক্ষতি বুঝে নিলেন।

ঠিক তখনই একজন সৈনিক দক্ষিণে ইশারা করে বলল—

“কমান্ডার, ওটা দেখুন… মনে হচ্ছে কোনো সওয়ারী!”

সামির চোখ সরু করে তাকালেন।

তারপর ধীরস্বরে বললেন—

“হ্যাঁ… একজন আরোহী।

আর মনে হয়—

পুরুষ নয়… একজন মহিলা।”

সৈনিক জিজ্ঞেস করল,

“আমাদের কেউ?”

সামির মাথা নাড়িয়ে বললেন—

“না। আমাদের সেনাবাহিনীতে এখনো কোনো মেয়ে নেই।

ওর চুল দেখছো না—বাতাসে উড়ছে।”

তিনি কড়া স্বরে আদেশ দিলেন—

“দুটি ঘোড়া আনো।

অন্ধকার নামার আগেই ওর কাছে পৌঁছাতে হবে।”

কিন্তু সামনে পথ ভরা চোরা বালিতে।

ঘোড়া দৌড়াতে পারে না দ্রুত।

তবু তারা ছুটল সর্বশক্তি দিয়ে।

যুবতীর কাছে পৌঁছাতে পৌঁছাতে

সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমে এলো।

ঘোড়াটি তখন মাথা নুইয়ে ধীরে এগোচ্ছিল।

ঘ্রাণ শুঁকে শুঁকে এগোচ্ছিল মানুষের গন্ধের দিকে—

ক্যাম্পের দিকেই।

আরোহী মেয়েটি ঝুলে আছে ঘোড়ার ঘাড়ের কাছে—

চুল এলোমেলো, মাথা নিচু,

চেতনাহীন।

কমান্ডার কাছে যেতেই

ঘোড়াটির চলার গতি আরও কমে যায়।

সামির নিচু হয়ে মেয়েটির পা রেকাব থেকে ছাড়িয়ে

তাকে পাজাকোলে নিয়ে ঘোড়া থেকে নামালেন।

“বেঁচে আছে,” তিনি বললেন।

“মনে হয় ফিরিঙ্গি।

তুমি ঘোড়াটাকে সামলাও।”

মেয়েটিকে নিজের ঘোড়ার পিঠে তুলে

তারা দ্রুত ক্যাম্পে ফিরে এলো।

কমান্ডার তাকে নিজের তাঁবুতেই নিয়ে গেলেন—

অন্য কোনো তাঁবু খালি ছিল না।

চুলে-বালিতে ভরা মুখে পানি ছিটালেন।

তারপর ধীরে ধীরে পানি দিলেন তার মুখে।

মেয়েটির চোখ দু’টো কাঁপতে কাঁপতে খুলে গেল।

সামিরের দিকে তাকিয়ে রইল অস্ফুট দৃষ্টিতে।

জ্ঞান ফিরে পেল সে—

স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন সামির মাহতীর।

মেয়েটা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল—

“আমি কি… এখন ফিলিস্তিনে?”

সামির মাথা নেড়ে বোঝালেন—

তিনি তার ভাষা বোঝেন না।

তখন মেয়েটা আরবিতে বলল—

“তুমি কে? আমি কোথায়?”

সামির শান্ত গলায় বললেন—

“আমি মুসলিম বাহিনীর কমান্ডার, সামির মাহতীর।

তুমি এখন মিশরে।”

মেয়েটার চোখ আতঙ্কে বড় হয়ে উঠল—

যেন আবারও অজ্ঞান হয়ে পড়বে।

সামির বললেন—

“ভয় পেও না।

নিজেকে সামলে নাও।

তুমি আমার অতিথি।

আমি মুসলমান।

আমাদের সৈন্যরা নারীদের সম্মান করতে জানে।

তুমি যে ধর্মেরই হও—

তোমার ইজ্জত সুরক্ষিত থাকবে।”

একজন সৈনিককে তিনি বললেন—

“পানি আর খাবার আনো।”

পানি পেয়ে মেয়েটা গ্লাসটা লুফে নিয়ে

একটানে পান করতে লাগল।

সামির নরম হাতে তার ঠোঁট থেকে গ্লাস সরিয়ে নিলেন—

“আস্তে।

আগে কিছু খাও, তারপর পানি।”

খেয়ে-পিয়ে

তার মুখে একটু আলো ফিরে এলো।

তার জন্য গোসলের ব্যবস্থা হলো।

গোসল শেষে সে তাঁবুতে ঢুকতেই

কমান্ডার পর্দা টেনে তাঁবুটিকে দুই ভাগ করে দিলেন।

কিন্তু মেয়েটার ভীতি তখনও কাটেনি।

কারণ শৈশব থেকে তাকে শেখানো হয়েছে—

মুসলমান মানেই বর্বর, নারীর শত্রু,

পশুর চেয়েও ভয়ংকর।

তার চোখে তখনও ভাসছে

সেই মরু ঝড়,

সঙ্গীদের ভয়াবহ মৃত্যু,

আর নিজের পাপের কালো ছায়া।

গোসলের সময় তার মনে হচ্ছিল—

সে এতটাই অপবিত্র

যেন পৃথিবীর সব পানি ঢেলেও

তার সেই অপবিত্রতা ধুয়ে যাবে না।

 

 

পর্ব:০৫

এমন অসামান্য রূপবতী তরুণী সাধারণ কোনো ঘরের মেয়ে হতে পারে না—

সামির মাহতীর প্রথম দেখাতেই বুঝে গিয়েছিলেন।

কিন্তু ফিরিঙ্গি এই তরুণী এ দুর্গম মরু অঞ্চলে এলো কীভাবে—

এই প্রশ্ন তোলপাড় করছিল তার মনে।

সিনথিয়া বলেছিল—ঝড়ের কবলে পড়ে কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে সে।

কিন্তু সে কথা বিশ্বাস হলো না কমান্ডারের।

গত দুই দিনে এ অঞ্চলে কোনো কাফেলা যাতায়াত করেনি।

হলে টহল দলের নজরে অবশ্যই পড়ত।

তিনি আবার বললেন,

“সত্যি করে বলো—তুমি এখানে কীভাবে এলে?”

মেয়েটা আগের কথাই পুনরাবৃত্তি করল,

“বলেছি তো, কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে।”

সামির শান্ত, অথচ দৃঢ় গলায় বললেন,

“যদি বলতে—তোমাকে অপহরণ করা হয়েছিল, ঝড় তোমাকে অপহরণকারীর কাছ থেকে ছিটকে দিয়েছে—

তবুও বিশ্বাস করতাম।

কিন্তু তুমি যা বলছো—এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

আমার কাছে মিথ্যা বলার প্রয়োজন নেই তোমার।”

ঠিক তখন এক সিপাই তাবুর পর্দা সামান্য ঠেলে ঢুকল—

একটি থলি এবং মশক হাতে।

“ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা ছিল, কমান্ডার।”

সামির থলিটা হাতে নিতেই মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি তা লক্ষ্য করলেন।

থলিটা তার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন—

“নিজেই খোলো। দেখো সব ঠিক আছে কিনা।”

মেয়েটা যেন বোবা হয়ে গেল।

বাচ্চার মতো থলিটা নিজের দিকে টেনে নিল—

খুলল না।

সামির বললেন,

“তোমাকে আটকে রাখার অধিকার নেই আমার।

তুমি চাইলে চলে যেতে পারো।

কিন্তু মরুর মাঝে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া একজন মেয়েকে

একা ফেলে দিতে পারি না আমি।

মানবিকভাবে তোমার হেফাজত করা আমার দায়িত্ব।

তোমার বাড়ির ঠিকানা বলো—

সিপাহীরা পৌঁছে দেবে।

তুমি মিশর বা সুদান—

কোনোটারই বাসিন্দা বলে মনে হয় না।”

এই কথা শুনতেই মেয়েটার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

অতীতের আতঙ্ক তাকে এখনো শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছে।

হঠাৎ সে থলিটা সামির মাহতীরের দিকে ছুঁড়ে দিল।

সামির থলি খুললেন।

ভেতরে—

কিছু খেজুর, সামান্য কিছু মেয়েলি জিনিস,

আর একটি পুটলি।

পুটলি খুলতেই পাওয়া গেল—

অনেকগুলো স্বর্ণমুদ্রা,

একটি সোনার চেইন,

ও তাতে ঝোলানো কাঠের তৈরি একটি ক্রুশ।

সামির বললেন,

“এগুলো থেকে আমি আমার  প্রশ্নের জবাব পাইনি।”

মেয়েটা চুপ।

মেয়েটা বললো,

“এ স্বর্ণমুদ্রাগুলো যদি তোমাকে দিই—তুমি আমাকে সাহায্য করবে?”

“কি ধরনের সাহায্য?”

“আমাকে ফিলিস্তিন পৌঁছে দেবে।

তবে প্রশ্ন কোরো না।”

সামির বললেন,

“ফিলিস্তিন পৌঁছে দেব—

কিন্তু প্রশ্নও করব।”

মেয়েটা ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,

“যদি কোনো প্রশ্ন না করো—

তাহলে অন্য পুরস্কার পাবে।”

“কী পুরস্কার?”

“আমার ঘোড়াটা তোমাকে দেব।

আর তিন দিনের জন্য…

আমার দেহ হবে তোমার।”

সামির চমকে গেলেন না—

বরং গভীরভাবে তাকালেন তার দিকে।

তিনি আগে কখনো এত স্বর্ণ একসঙ্গে দেখেননি।

আর এত অপূর্ব রূপ—

যা সিংহাসন বদলে দিতে পারে।

তার রেশমি চুল যেন সোনার তারের মতো ঝলমল করছে।

চোখে অদ্ভুত এক জাদু—

যা এক সম্রাটকে আরেক সম্রাটের শত্রু বানানোর মতো শক্তিশালী।

সামিরের সামনে তখন

সৌন্দর্য, স্বর্ণ, প্রলোভন—সবকিছুর পরীক্ষা।

কিন্তু তিনি থলির জিনিসপত্র আবার বেঁধে পুটলিটা মেয়েটার হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

সিনথিয়া বিস্ময়ে বলল,

“বিনিময় কি খুব কম হলো?”

সামির হালকা হাসলেন—

এক তীব্র, দৃঢ় হাসি।

“অনেক কম।

ঈমানের মূল্য

আল্লাহ ছাড়া কেউ দিতে পারে না।”

মেয়েটা কিছু বলতে চাইলে

সামির তাকে থামালেন—

“আমি আমার কর্তব্য আর ঈমান বিক্রি করব না।

আমি আছি বলে মিশর নিশ্চিন্তে ঘুমায়।

তিন মাস আগে সুদানীরা কায়রো আক্রমণের চেষ্টা করেছিল।

যদি ঈমান বিক্রি করতাম—

আজ কায়রো তাদের দখলে থাকত।

তোমাকে তাদের চেয়েও ভয়ংকর মনে হচ্ছে।”

মেয়েটার ঠোঁট কাঁপল।

“তুমি তো কোনো গোয়েন্দা নও?”

মেয়েটা ফিসফিস করে বলল,

“না… বলো—

ঝড় একজন অত্যাচারীর কবল থেকে আমাকে রক্ষা করেছে।”

তার এই অর্থহীন জবাবে সামির বললেন,

“তুমি কে—কোথা থেকে এসেছ—

তা জানাটা জরুরি নয়।

কাল তোমাকে কায়রোর আমাদের গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দেব।

তারপর কী হবে—

তা তোমাদের ব্যাপার।”

মেয়েটা ক্লান্ত গলায় বলল,

“অনুমতি পেলে একটু বিশ্রাম নেব।

কাল হয়তো তোমার প্রশ্নের জবাব দিতে পারব।”

সিনথিয়া সেই রাতেই গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল—

এক ভয়ংকর ভ্রমণ শেষে।

রাত গভীর।

তাবুর আলো দুলছে।

কমান্ডার মাত্র কয়েক কদম দূরে ঘুমাচ্ছেন।

হঠাৎ—

এক বিকট চিৎকার।

সামির চোখ মেলে তাকালেন।

মেয়েটা কাঁপছে,

চোখে-মুখে আতঙ্ক জমাট।

তিনি কাছে যেতেই

সিনথিয়া তাকে জাপটে ধরে কাঁদতে লাগল—

“ওরা আসবে!

ওরা আমাকে কুমিরের মুখে ছুঁড়ে দেবে!

ওরা আমার মাথা কেটে ফেলবে… আমাকে বাঁচাও!”

কমান্ডার কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলেন—

“কারা?”

“কালো কাফ্রীরা!

ওরা এখানেও এসেছিল…

আমাকে বলি দেওয়ার জন্য…”

এ কথা শুনে কমান্ডার বুঝলেন—

সেই বলিদানকারী উপজাতি।

সম্ভবত তাকে সত্যিই বলি দিতে নেওয়া হয়েছিল।

“তোমাকে কি বলির জন্য অপহরণ করা হয়েছিল?”

মেয়েটা তার গলা আঁকড়ে ধরে বলল,

“আর কিছু জিজ্ঞেস কোরো না।

দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম।”

সামির মাথায় হাত রেখে বললেন,

“কেউ তোমাকে এখান থেকে নিতে পারবে না।

নিশ্চিন্তে ঘুমাও।”

“আমি আর ঘুমোতে পারব না…

আমার সাথে কথা বলবে?

এভাবে জেগে থাকতে পারব না… আমি পাগল হয়ে যাব…”

সামির বললেন—

“ঠিক আছে। তুমি যখন ভয় পাচ্ছ—

আমি জেগে থাকব।

এখানে তুমি নিরাপদ।”

সেই রাত দু’জনে কথা বলতে বলতে কেটে গেল।

তুর্কিস্তান, মিশর, যুদ্ধ, মরুভূমির গল্পে

তাদের ভয় আর ক্লান্তি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।

মেয়েটা অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ল।

ভোরের আলো ফোটার আগে

মেয়েটার ঘুম ভাঙল।

দেখল—

সামির মাহতীর ফজরের নামাজ পড়ছেন।

প্রার্থনায় তোলা হাতের দিকে

ও একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

নামাজ শেষ হলে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল—

“তুমি খোদার কাছে কী চেয়েছ?”

সামির শান্ত কণ্ঠে বললেন—

“অন্যায় প্রতিরোধ করার শক্তি।”

মেয়েটার চোখে বিস্ময়ের ছায়া।

তারপর ধীরে বলল—

“তুমি কি স্বর্ণ আর সুন্দরী যুবতী পাওয়ার জন্য

খোদার কাছে প্রার্থনা করোনি?”

 

এমন অসামান্য রূপবতী তরুণী সাধারণ কোনো ঘরের মেয়ে হতে পারে না—

সামির মাহতীর প্রথম দেখাতেই বুঝে গিয়েছিলেন।

কিন্তু ফিরিঙ্গি এই তরুণী এ দুর্গম মরু অঞ্চলে এলো কীভাবে—

এই প্রশ্ন তোলপাড় করছিল তার মনে।

সিনথিয়া বলেছিল—ঝড়ের কবলে পড়ে কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছে সে।

কিন্তু সে কথা বিশ্বাস হলো না কমান্ডারের।

গত দুই দিনে এ অঞ্চলে কোনো কাফেলা যাতায়াত করেনি।

হলে টহল দলের নজরে অবশ্যই পড়ত।

তিনি আবার বললেন,

“সত্যি করে বলো—তুমি এখানে কীভাবে এলে?”

মেয়েটা আগের কথাই পুনরাবৃত্তি করল,

“বলেছি তো, কাফেলা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে।”

সামির শান্ত, অথচ দৃঢ় গলায় বললেন,

“যদি বলতে—তোমাকে অপহরণ করা হয়েছিল, ঝড় তোমাকে অপহরণকারীর কাছ থেকে ছিটকে দিয়েছে—

তবুও বিশ্বাস করতাম।

কিন্তু তুমি যা বলছো—এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।

আমার কাছে মিথ্যা বলার প্রয়োজন নেই তোমার।”

ঠিক তখন এক সিপাই তাবুর পর্দা সামান্য ঠেলে ঢুকল—

একটি থলি এবং মশক হাতে।

“ঘোড়ার জিনের সঙ্গে বাঁধা ছিল, কমান্ডার।”

সামির থলিটা হাতে নিতেই মেয়েটার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

তিনি তা লক্ষ্য করলেন।

থলিটা তার হাতে ফিরিয়ে দিয়ে বললেন—

“নিজেই খোলো। দেখো সব ঠিক আছে কিনা।”

মেয়েটা যেন বোবা হয়ে গেল।

বাচ্চার মতো থলিটা নিজের দিকে টেনে নিল—

খুলল না।

সামির বললেন,

“তোমাকে আটকে রাখার অধিকার নেই আমার।

তুমি চাইলে চলে যেতে পারো।

কিন্তু মরুর মাঝে অজ্ঞান অবস্থায় পাওয়া একজন মেয়েকে

একা ফেলে দিতে পারি না আমি।

মানবিকভাবে তোমার হেফাজত করা আমার দায়িত্ব।

তোমার বাড়ির ঠিকানা বলো—

সিপাহীরা পৌঁছে দেবে।

তুমি মিশর বা সুদান—

কোনোটারই বাসিন্দা বলে মনে হয় না।”

এই কথা শুনতেই মেয়েটার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।

অতীতের আতঙ্ক তাকে এখনো শৃঙ্খলে বেঁধে রেখেছে।

হঠাৎ সে থলিটা সামির মাহতীরের দিকে ছুঁড়ে দিল।

সামির থলি খুললেন।

ভেতরে—

কিছু খেজুর, সামান্য কিছু মেয়েলি জিনিস,

আর একটি পুটলি।

পুটলি খুলতেই পাওয়া গেল—

অনেকগুলো স্বর্ণমুদ্রা,

একটি সোনার চেইন,

ও তাতে ঝোলানো কাঠের তৈরি একটি ক্রুশ।

সামির বললেন,

“এগুলো থেকে আমি আমার  প্রশ্নের জবাব পাইনি।”

মেয়েটা চুপ।

মেয়েটা বললো,

“এ স্বর্ণমুদ্রাগুলো যদি তোমাকে দিই—তুমি আমাকে সাহায্য করবে?”

“কি ধরনের সাহায্য?”

“আমাকে ফিলিস্তিন পৌঁছে দেবে।

তবে প্রশ্ন কোরো না।”

সামির বললেন,

“ফিলিস্তিন পৌঁছে দেব—

কিন্তু প্রশ্নও করব।”

মেয়েটা ঠাণ্ডা কণ্ঠে বলল,

“যদি কোনো প্রশ্ন না করো—

তাহলে অন্য পুরস্কার পাবে।”

“কী পুরস্কার?”

“আমার ঘোড়াটা তোমাকে দেব।

আর তিন দিনের জন্য…

আমার দেহ হবে তোমার।”

সামির চমকে গেলেন না—

বরং গভীরভাবে তাকালেন তার দিকে।

তিনি আগে কখনো এত স্বর্ণ একসঙ্গে দেখেননি।

আর এত অপূর্ব রূপ—

যা সিংহাসন বদলে দিতে পারে।

তার রেশমি চুল যেন সোনার তারের মতো ঝলমল করছে।

চোখে অদ্ভুত এক জাদু—

যা এক সম্রাটকে আরেক সম্রাটের শত্রু বানানোর মতো শক্তিশালী।

সামিরের সামনে তখন

সৌন্দর্য, স্বর্ণ, প্রলোভন—সবকিছুর পরীক্ষা।

কিন্তু তিনি থলির জিনিসপত্র আবার বেঁধে পুটলিটা মেয়েটার হাতে ফিরিয়ে দিলেন।

সিনথিয়া বিস্ময়ে বলল,

“বিনিময় কি খুব কম হলো?”

সামির হালকা হাসলেন—

এক তীব্র, দৃঢ় হাসি।

“অনেক কম।

ঈমানের মূল্য

আল্লাহ ছাড়া কেউ দিতে পারে না।”

মেয়েটা কিছু বলতে চাইলে

সামির তাকে থামালেন—

“আমি আমার কর্তব্য আর ঈমান বিক্রি করব না।

আমি আছি বলে মিশর নিশ্চিন্তে ঘুমায়।

তিন মাস আগে সুদানীরা কায়রো আক্রমণের চেষ্টা করেছিল।

যদি ঈমান বিক্রি করতাম—

আজ কায়রো তাদের দখলে থাকত।

তোমাকে তাদের চেয়েও ভয়ংকর মনে হচ্ছে।”

মেয়েটার ঠোঁট কাঁপল।

“তুমি তো কোনো গোয়েন্দা নও?”

মেয়েটা ফিসফিস করে বলল,

“না… বলো—

ঝড় একজন অত্যাচারীর কবল থেকে আমাকে রক্ষা করেছে।”

তার এই অর্থহীন জবাবে সামির বললেন,

“তুমি কে—কোথা থেকে এসেছ—

তা জানাটা জরুরি নয়।

কাল তোমাকে কায়রোর আমাদের গোয়েন্দা হেডকোয়ার্টারে পাঠিয়ে দেব।

তারপর কী হবে—

তা তোমাদের ব্যাপার।”

মেয়েটা ক্লান্ত গলায় বলল,

“অনুমতি পেলে একটু বিশ্রাম নেব।

কাল হয়তো তোমার প্রশ্নের জবাব দিতে পারব।”

সিনথিয়া সেই রাতেই গভীর ঘুমে ঢলে পড়ল—

এক ভয়ংকর ভ্রমণ শেষে।

রাত গভীর।

তাবুর আলো দুলছে।

কমান্ডার মাত্র কয়েক কদম দূরে ঘুমাচ্ছেন।

হঠাৎ—

এক বিকট চিৎকার।

সামির চোখ মেলে তাকালেন।

মেয়েটা কাঁপছে,

চোখে-মুখে আতঙ্ক জমাট।

তিনি কাছে যেতেই

সিনথিয়া তাকে জাপটে ধরে কাঁদতে লাগল—

“ওরা আসবে!

ওরা আমাকে কুমিরের মুখে ছুঁড়ে দেবে!

ওরা আমার মাথা কেটে ফেলবে… আমাকে বাঁচাও!”

কমান্ডার কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করলেন—

“কারা?”

“কালো কাফ্রীরা!

ওরা এখানেও এসেছিল…

আমাকে বলি দেওয়ার জন্য…”

এ কথা শুনে কমান্ডার বুঝলেন—

সেই বলিদানকারী উপজাতি।

সম্ভবত তাকে সত্যিই বলি দিতে নেওয়া হয়েছিল।

“তোমাকে কি বলির জন্য অপহরণ করা হয়েছিল?”

মেয়েটা তার গলা আঁকড়ে ধরে বলল,

“আর কিছু জিজ্ঞেস কোরো না।

দুঃস্বপ্ন দেখছিলাম।”

সামির মাথায় হাত রেখে বললেন,

“কেউ তোমাকে এখান থেকে নিতে পারবে না।

নিশ্চিন্তে ঘুমাও।”

“আমি আর ঘুমোতে পারব না…

আমার সাথে কথা বলবে?

এভাবে জেগে থাকতে পারব না… আমি পাগল হয়ে যাব…”

সামির বললেন—

“ঠিক আছে। তুমি যখন ভয় পাচ্ছ—

আমি জেগে থাকব।

এখানে তুমি নিরাপদ।”

সেই রাত দু’জনে কথা বলতে বলতে কেটে গেল।

তুর্কিস্তান, মিশর, যুদ্ধ, মরুভূমির গল্পে

তাদের ভয় আর ক্লান্তি ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে গেল।

মেয়েটা অবশেষে ঘুমিয়ে পড়ল।

ভোরের আলো ফোটার আগে

মেয়েটার ঘুম ভাঙল।

দেখল—

সামির মাহতীর ফজরের নামাজ পড়ছেন।

প্রার্থনায় তোলা হাতের দিকে

ও একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল।

নামাজ শেষ হলে মেয়েটা জিজ্ঞেস করল—

“তুমি খোদার কাছে কী চেয়েছ?”

সামির শান্ত কণ্ঠে বললেন—

“অন্যায় প্রতিরোধ করার শক্তি।”

মেয়েটার চোখে বিস্ময়ের ছায়া।

তারপর ধীরে বলল—

“তুমি কি স্বর্ণ আর সুন্দরী যুবতী পাওয়ার জন্য

খোদার কাছে প্রার্থনা করোনি?”

 

 

পর্ব০৬

না চাইতেই এ দুটো—স্বর্ণ আর এক অপার রূপবতী তরুণী—খোদা আমাকে দিয়েছেন। অথচ এ দুটির উপর আমার কোন অধিকার নেই। সামির মাহতীর ধীরে বললেন,

“হয়তো তিনি আমাকে পরীক্ষা করছেন।”

মেয়েটা শান্তস্বরে জিজ্ঞেস করল,

“তুমি কি মনে করো, তিনি তোমাকে পাপের মোকাবেলা করার শক্তি দিয়েছেন?”

কমান্ডার উত্তর দিলেন,

“কেন, দেখনি? তোমার স্বর্ণ আর তোমার রূপ-যৌবন আমাকে আমার কর্তব্যচ্যুত করতে পারেনি। এটা আল্লাহর অনুগ্রহ। আমি তাঁর কাছেই এই শক্তি চাই।”

“তিনি কি পাপ মোচন করেন?” মেয়েটার কণ্ঠ কাঁপছিল।

“হ্যাঁ,” বললেন সামির, “তিনি পাপ মোচন করেন। তবে শর্ত হলো—সে পাপ বারবার করা যাবে না।”

মেয়েটা মাথা নিচু করল। তার কাঁধ কেঁপে উঠছে, চোখের পানি ঝরে পড়ছে নিঃশব্দে। কমান্ডার স্নিগ্ধভাবে ওর মাথায় হাত রেখে সান্ত্বনা দিলেন। তরুণী দু’হাত দিয়ে তাঁর হাত ধরে নিল, তারপর দু’চোখ বন্ধ করে কয়েকবার চুমু খেল।

সামির মাহতীর হাত সরিয়ে নিলেন লজ্জা ও অস্বস্তিতে।

ও বলল,

“আজ আমায় পাঠিয়ে দেবে কায়রো। তোমার সাথে হয়তো আর কখনো দেখা হবে না। আমি কে, কোথা থেকে এসেছি—বলতে খুব মন চাইছে। তুমি অনুমতি দিলে আমার বর্তমান অবস্থা বলবো।”

কমান্ডার তার কথা কেটে দিয়ে বললেন,

“যাত্রার সময় হয়েছে। আমি নিজেই তোমার সাথে যাচ্ছি। এ ধরনের বিপদজনক দায়িত্ব সাধারণত আমি অন্য কাউকে দিই না।”

“আমার পরিচয়টাও শুনবে না?” মেয়েটার কণ্ঠে ছিল অনুনয়।

“চলো,” শুধু এটুকুই বললেন তিনি। “এ কথা শোনার দায়িত্ব আমার নয়।”

বলে কমান্ডার তাবু থেকে বেরিয়ে গেলেন।

কায়রোর উদ্দেশ্যে ছয়টি ঘোড়া রওনা হলো।

সামনে সামির মাহতীর নিজে।

তার পিছনের ঘোড়ায় চেপেছে মেয়েটি।

আর তার পেছনে আড়াআড়ি চারজন দক্ষ রক্ষী।

একটি উটে বোঝাই করা হয়েছে প্রয়োজনীয় খাবার, পানি, আর সরঞ্জাম।

মরুপ্রান্তে সূর্য তখন ধীরে ধীরে সোনালি আলো ছড়াচ্ছে।

দূর থেকে মনে হচ্ছিল—যেন বিপদের অদৃশ্য ছায়া তাদের অনুসরণ করছে।

প্রায় ছত্রিশ ঘণ্টার দীর্ঘ যাত্রা। পথের মধ্যে দু’বার সিনথিয়া চেষ্টা করেছিল সামির মাহতীরের ঘোড়ার পাশে পাশাপাশি চলতে।

প্রতিবারই কমান্ডার দৃঢ় গলায় বলেছিলেন—

“তোমার ঘোড়া সৈন্যদের মাঝেই রাখো।”

সূর্যাস্তের পর তিনি কাফেলা থামিয়ে তাঁবু টানানোর নির্দেশ দিলেন। সেই রাতেও মেয়েটাকে শুইয়ে দেওয়া হলো তাঁর নিজের তাঁবুতেই—যেমন আগের রাতে। প্রদীপ জ্বলছে। মরুর বাতাস ছায়ার মতো দুলছে। সামির মাহতীর ঘুমিয়ে পড়লেন ক্লান্তির কাছে হার মেনে।

রাতের গভীর কোনো এক প্রহরে হঠাৎ কারো কোমল স্পর্শে তাঁর ঘুম ভেঙে গেল।

চোখ খুলতেই দেখলেন—সিনথিয়া ঠিক তাঁর পাশে বসে আছে।

আঙুল দিয়ে তাঁর মাথায় আলতো করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।

তিনি তড়াক করে উঠে বসলেন।

মেয়েটা কাঁদছে—চোখ ভিজে, গাল বেয়ে অশ্রু নেমে আসছে।

সিনথিয়া তাঁর হাত দুটো নিজের হাতে তুলে নিয়ে ঠোঁট ছোঁয়ালো।

তারপর যেন শিশুর মতো ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।

সামির মাহতীর স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন।

মেয়েটা চোখ মুছে বলল—

“আমি তোমার দুশমন… তোমার দেশের বিরুদ্ধে গুপ্তচরবৃত্তি করতে এসেছি। এসেছি তোমাদের বড় কর্মকর্তাদের মাঝে শত্রুতা সৃষ্টি করতে। সালাউদ্দিন আইয়ুবীকে হত্যা করার আদেশ নিয়ে আমাকে ফিলিস্তিন থেকে পাঠানো হয়েছে।

কিন্তু এখন… আমার মনে কোনো শত্রুতা নেই।”

সামির ঠান্ডা স্বরে বললেন—

“তুমি খুব ভীতু মেয়ে। আপন জাতির সাথে গাদ্দারি করছো!

শূলের কাঠেও দাঁড়িয়ে একজন ক্রুশধারী বলার কথা—

‘আমি ক্রুশের জন্য জীবন দিলাম।’

কিন্তু তুমি?”

মেয়েটা চোখ তুলে তাকাল—তার দৃষ্টি ভাঙা, ক্লান্ত, তবু অদ্ভুত সত্যনিষ্ঠ।

“জানো কেন আমার মনে আর শত্রুতা নেই?

কারণ তুমি প্রথম পুরুষ—যে আমার রূপ, যৌবন, প্রলোভন… সবকিছু ঘৃণা করলে। আমাকে প্রত্যাখ্যান করলে।

আমি যত পুরুষ দেখেছি—প্রত্যেকে আমাকে পাওয়ার জন্য উন্মুখ ছিল।

আমার দেহই ছিল আমার অস্ত্র। আমার জীবন। আমার পরিচয়।”

তার গলা আরো নিচু হলো—

“আমাদের শেখানো হয়েছে—যা তোমাদের কাছে পাপ, তা আমাদের কাছে শিল্প।

আমাদের বলা হয়েছে—ক্রুশই খোদার প্রতীক, আর মুসলমানরা ক্রুশের শত্রু।

বিশ্ব শাসনের অধিকার কেবল ক্রুশধারীদের।

এটাই আমাদের ধর্মের মূলনীতি।”

সামির একটুও বিচলিত হলেন না—

“তোমাদের ধর্মের মূলনীতি আমি জানি।

তোমার কাহিনী শোনার সময় এখন নয়।

যা বলার কায়রো গিয়েই বলবে।”

মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর হঠাৎ ফিসফিস করে বলল—

“ফারুক নামের এক কমান্ডারকে চেনো?”

সামির কপাল কুঁচকে গেল।

“সে ছিল খলিফার রক্ষী বাহিনীর কমান্ডার… সুদানীদের ষড়যন্ত্রে সে-ও জড়িত ছিল।

এখন কোথায় আছে জানি না। শুধু আদেশ আছে—দেখামাত্র গ্রেফতার করতে হবে। পালাতে চাইলে তীর ছুড়ে হত্যা করারও অনুমতি রয়েছে। তুমি তাকে কীভাবে চেনো?”

সিনথিয়া কাঁপা গলায় বলল—

“সে এখন সুদানের কাফ্রীদের কাছে বন্দি।

সে খুব মনোরম জায়গা—যেখানে কাফ্রীরা যুবতীদের দেবতার নামে বলি দেয়।

আমাদের তিনজনকে ফিলিস্তিন থেকে তার সঙ্গে পাঠানো হয়েছিল।

অন্য দু’জন…?”

তার গলা ভেঙে গেল—

“ওরা আর বেঁচে নেই।”

সামির চমকে উঠলেন—

“কীভাবে মারা গেল তারা?”

মেয়েটার চোখে তখন মরুভূমির তীব্র নিঃসঙ্গতা আর ভয়ের ছায়া।

“বলি দেওয়ার জন্য।

ফারুকের আচরণ…

তাদের পালানোর চেষ্টা…

ঝড়…

সব বললো সামিরকে।”

তারপর হঠাৎ সে শূন্যের দিকে তাকিয়ে যেন নিজেরই বিচার করতে লাগল—

“আমি নিজেকে শাহজাদী মনে করতাম। সম্রাটদের হৃদয়ের রানী।

খোদা আছে—মৃত্যু আছে—কখনো অনুভব করিনি।

আমাদের পাপের সমুদ্রে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছিল…

আর আমরা সানন্দে ডুবে ছিলাম।”

তার কণ্ঠ বেদনাময় হয়ে উঠল—

“আমাদের সামনে কুমির দেখানো হলো—

মস্তকবিহীন যুবতীদের দেহ যাদের খাদ্য।

কুমিরগুলো তীরে শুয়ে তাকিয়ে থাকে…

আমরা ভয়ে কাঁপতাম।

যে দেহের সামনে সম্রাটেরাও মাথা নোয়ায়—

সেই দেহই হবে কুমিরের খাদ্য!”

আমাদের মাথা কাটার জন্য যেসব কুৎসিত কাফ্রীরা এগিয়ে এসেছিল, তাদের মুখ আমি স্পষ্ট দেখেছি। চোখের সামনে ভেসে উঠেছিল মৃত্যুর বিভীষিকা। সেই মুহূর্তে যেন হঠাৎ জেগে উঠল বহুদিন ঘুমিয়ে থাকা বিবেক—আত্মার গভীর থেকে প্রশ্ন উঠল, “এই অনন্য রূপ, এই মাদকতাময় দেহ—এর পরিণাম দেখো! এটাই তোমার পথের শেষ?”

মরণপণ করেই আমরা তিনজন পালিয়েছিলাম।

ফারুকের হাতে আমাদের তুলে দিয়ে বলা হয়েছিল,

— “এ লোকটি তোমাদের রক্ষা করবে।”

কিন্তু সেই রক্ষকই যখন লালসার হাত বাড়ালো, বুঝলাম আমাদের মৃত্যু কেবল সময়ের অপেক্ষা। আমরা ছুটলাম প্রাণ বাঁচাতে।

ঝড়ের কবলে ঘোড়াগুলো দিশেহারা হয়ে পড়ল। প্রথমে একটি মেয়ে পড়ে গেল। ঘোড়ার খুর আর ভারী দেহের নিচে চাপা পড়তে পড়তে সে শেষ নিঃশ্বাস নিল। অসহায়ের মতো সে দৃশ্য দেখলাম—কিছু করার ছিল না।

তারপর দ্বিতীয়টি। ঘোড়ার পিঠে ঝুলতে ঝুলতে বিদীর্ণ হল তার বুকফাটা আর্তনাদ। আজও সে চিৎকার আমার কানে বাজে। বোধহয় যতদিন বাঁচব শোনতে থাকব।

আমি তখন একা। ঘোড়াটা ছুটছিল, কিন্তু বশ মানছিল না। দুই সহচরীর মৃত্যু যেন আমাকে বুঝিয়ে দিল—এটাই আমার পরিণতি। যাদের রূপ আর হাসিতে রাজা-বাদশাহরা নত হতো, সেই মেয়েরা আজ পরিচয়হীন বালির নিচে সমাহিত।

চারদিকে যেন প্রেতাত্মার হাসি। ঝড়ের হাহাকার। মনে হচ্ছিল মৃত্যু আমাকে হাত বাড়িয়ে ডাকছে।

ঠিক তখনই প্রথমবার খোদাকে মনে পড়ল।

বারবার ক্ষমা চাইলাম। বললাম—“আরেকবার শুধু বাঁচাও। পথ দেখাও।”

তারপর অজ্ঞান হয়ে গেলাম।

জ্ঞান ফিরতেই দেখলাম আমি তোমার কব্জায়।

তোমার সাদা চামড়া দেখে মুহূর্তে খুশি হয়েছিলাম—ভেবেছিলাম ইউরোপীয়। নিজের ভাষায় বললাম নিজের পরিচয়। কিন্তু যখন জানলাম তুমি মুসলমান, মনে হল ঝড় থেকে বাঁচলেও শত্রুর হাতে ধরা পড়েছি।

আমাদের শেখানো হয়েছিল—মুসলমানরা মেয়েদের সাথে  পশুর মতো ব্যবহার করে!

কিন্তু তুমি…

তুমি তো পুরোটা উল্টো করে দিলে।

স্বর্ণ নিলে না।

আমার দেহের আহ্বান ফিরিয়ে দিলে।

আমি আতঙ্কিত ছিলাম—একা, অসহায়, যেকারো বুকে মাথা রাখতাম। কিন্তু তোমাকে দেখে ভেঙে পড়েছিলাম।

রাতে কুমীর দেখলাম স্বপ্নে। কাফ্রীদের দেখলাম। ঘুম ভেঙে চিৎকার করে উঠেছিলাম। তুমি শিশুর মতো আমাকে অভয় দিলে।

ভোরে দেখি তুমি নামাজ পড়ছো। দোয়ার সময় তোমার চোখে ছিল এক অনাবিল প্রশান্তি—এক অদ্ভুত আলো। তখন প্রথম সন্দেহ হল, তুমি কি সত্যিই মানুষ?

কোন মানুষ সোনা ফিরিয়ে দেয়? কোন মানুষ এমন নারীকে প্রত্যাখ্যান করে?

তোমাকে দেখে আমার মনও লোভী হয়ে উঠল সেই প্রশান্তির প্রতি। ভাবলাম—এ প্রশান্তি কোথা থেকে পেয়েছ তুমি?

তোমাকে আর ভুলের মধ্যে রাখতে মন চাইল না। তাই সব খুলে বললাম। হয়তো ভাবছো এগুলো প্রতারণার কৌশল—তুমি যেমন ইচ্ছে ভাবো। কিন্তু আমি আমার আত্মাকে আর ধোঁকা দিতে পারি না।

তোমার প্রতি যে ভালোবাসা জন্মেছে—তার দায় কি আমার?

আমি তো এসেছিলাম তোমাদের হত্যা করতে!

কিন্তু তোমার চরিত্র, তোমার নামাজ, তোমার শান্ত মুখ…

সেইসব আমাকে বদলে দিয়েছে।

আমি জানি, এই জীবনে তোমার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকতে পারব না।

কাল তোমাকে পাপের দিকে ডাকছিলাম—আজ চাই জীবনভর তোমার পায়ের কাছে থাকতে।

তোমার দাসী হতে দাও আমাকে।

বদলে দিও সেই প্রশান্তি, যা তোমার নামাজে দেখেছি।

সামির মাহতীর দীর্ঘক্ষণ নীরব রইল।

তারপর বলল—

“আমি বলব না তুমি প্রতারণা করছ। কিন্তু জানিয়ে দিচ্ছি—আমার জাতিকে আমি ধোঁকা দিতে পারব না। তুমি আমার কাছে আমানত। আর আমানতের খেয়ানত আমি করব না।

তোমার সাথে যে ব্যবহার করেছি—তা শুধু আমার কর্তব্য।”

 

 

পর্ব:০৭

“কায়রোর নির্দিষ্ট ঠিকানায় তোমাকে পৌঁছে দিলেই আমার দায়িত্ব শেষ,”

সামির মাহতীর শান্ত গলায় বলল।

“এরপর আমাকে নির্দেশ দেয়া হবে—সামির, এবার তুমি ফিরে যাও।”

সিনথিয়ার চোখে তখন অঝোর অশ্রু। অল্প সামনে ঝুঁকে মিনতি-ঝরা চোখে তাকাল সামিরের দিকে।

“তোমার কাছে আমার একটা ছোট্ট আবেদন,” বলল সে।

“তোমাদের সুলতান যখন আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেবেন, তুমি… শুধু আমার হাত ধরে পাশে দাঁড়িয়ে থাকবে।”

কথা বলতে বলতে আবার চোখ ভিজে উঠল তার। কণ্ঠ যেন ভাঙা বাঁশির মতো কাঁপছে।

“এখন আর ফিলিস্তিনে পৌঁছে দিতে অনুরোধ করব না তোমাকে।

তোমার কর্তব্যের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াব না।

শুধু একবার বলো… তুমি কি আমার ভালোবাসা গ্রহণ করেছ?”

এক নিঃশ্বাস বলে, থেমে সে আবার বলল—

“এ অপবিত্র দেহ নিয়ে তোমার কাছে স্ত্রীর মর্যাদা চাই না। আমাদের ট্রেনিং ছিল নিষ্ঠুর—হৃদয়কে পাথরে পরিণত করা হয়েছিল। ভাবতাম মানবিক অনুভূতি বলে আমাদের মধ্যে কিছু নেই।

কিন্তু খোদা আমাকে দেখাল, মানুষ পাথর নয়। কোনো একদিন না একদিন তাকে জিজ্ঞাসা করতেই হয়—

মুসাফির, পথের শেষ আর কত দূর? ঠিক পথে চলছি তো?

এসো না, দু’জনে হাতে হাত রেখে আরেকটু পথ হাঁটি… নিরবে।”

রাত গভীর হয়ে আসছে। দু’জন কথা বলছে ধীরে ধীরে।

হঠাৎ সামির প্রশ্ন করল,

“তোমাদের মতো মেয়েদের তারা আমাদের দেশে পাঠায় কেন? এখানে তোমরা কী কাজ করো?”

সিনথিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল—

“কত কাজ!

তোমাদের আমীর ও মন্ত্রীদের হারেমে মুসলিম ছদ্মবেশে ঢুকিয়ে দেয়া হয় মেয়েদের।

ওরা বড় বড় আমীরদের হাত করে নেয়—খ্রিস্টানদের পছন্দের লোককে ক্ষমতায় বসায়।

যারা বিরোধিতা করে—তাদের হত্যা বা ক্ষমতাচ্যুত করে।

মুসলিম যুবতীদের রূপ আছে, কিন্তু কৌশল নেই।

আমরা—ইহুদি বা খ্রিস্টান মেয়েরা—ওদের দাস-দাসীতে পরিণত করি।

তোমাদের রাষ্ট্রের বড় বড় মাথারা আমাদের হাতে পুতুল হয়ে যায়।

কেউ আমাদের চক্করে এলে আর বেরোতে পারে না।

আমার মতো রূপসী ও অভিজাত মেয়েদের পাঠানো হয় গোপনে—

আমির, মন্ত্রী, কেল্লাদার—যে একবার প্রেমে পড়ে সে শেষ।

গোপন বাড়িতে লুকিয়ে রাখা হয় আমাদের—সন্দেহের ছায়াও পড়ে না সেখানে।

সেখান থেকেই আমরা দেশের বাঘা বাঘা মানুষের মাথা মাটির সাথে মিশিয়ে দিই।

আমাদের তিনজনকে পাঠানো হয়েছিল—

সালাউদ্দিন আইয়ুবী এবং নূরুদ্দিন জঙ্গীর মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করতে,

এবং সুযোগ পেলে তাদের হত্যা করতে।”

সামির নীরবে শুনে গেল।

সূর্যাস্তের কিছু আগে কাফেলা কায়রো পৌঁছাল।

সামির মাহতীর গোয়েন্দাপ্রধান আলীর কাছে সমস্ত ঘটনা খুলে বলল,

এবং সিনথিয়াকে তার হাতে তুলে দিল।

সামির বলল—

“ফারুক কাফ্রীদের কাছে আশ্রয় নিয়েছে। দেবতার আশ্রমে আছে। অনুমতি দিলে তাকে জীবিত বা মৃত ধরে আনব।”

আলী কয়েকজন কমান্ডো দিয়ে বললেন—“এখন বিশ্রাম করো।”

সিনথিয়াকে জেরা শুরু হলো। কিন্তু সে বলল—

“সামির মাহতীর আমার সামনে বসে থাকলে উত্তর দেব। নইলে আমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দিও—মুখ খুলব না।”

আলী বাধ্য হয়ে সামিরকে ডাকলেন। সে পাশে বসতেই মেয়েটা সব খুলে বলল—একটুও গোপন করল না।

শেষে বলল—

“আমাকে মৃত্যুদণ্ড দিন—কোনো দুঃখ নেই।

কিন্তু আমার শেষ ইচ্ছে একটাই—আমি সামির মাহতীরের হাতে মরতে চাই।”

আলী বিস্ময়ে বললেন—

“সে তোমার শত্রু সৈন্য, তার হাতে মরতে যাচ্ছ কেন?”

সিনথিয়া সব বুঝিয়ে বলল—কেন সামিরের প্রতি এমন ভালোবাসা।

আলী মেয়েটাকে জেলে না পাঠিয়ে সামিরের তত্ত্বাবধানে দিলেন এবং ছুটলেন সুলতানের কাছে।

সব খবর শুনে সুলতান সালাউদ্দিন আইয়ুবী ক্রোধে বললেন—

“মিথ্যা! মেয়েটা তোমাদের বিভ্রান্ত করতে চাইছে।

ফয়জুল ফাতেমী এমন হতে পারে না।”

আলী শান্ত গলায় বললেন—

“মহামান্য সুলতান, তিনি ফাতেমী বংশোদ্ভূত।

ফাতেমীরা ঘাতকদলের সহযোগী—আপনার প্রতি অনুগত হওয়ার কথা নয়।

খলিফা আল-আযেদও তাকে আপনার শত্রু বলেছিলেন।”

সুলতান গভীর চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। কিছুক্ষণ পর বললেন—

“প্রমাণ ছাড়া তাকে গ্রেফতার করতে দেব না। সুযোগমতো প্রমাণসহ ধরতে হবে।

সে সেনা প্রশাসনের প্রধান—যুদ্ধের সব গোপন তথ্য জানে।

দ্রুত প্রমাণ আনো।”

আলী বিন সুফিয়ান ফিরলেন সিনথিয়ার কাছে। সব বুঝিয়ে বললেন।

সিনথিয়া বলল—

“সামির বললে আমি আগুনেও ঝাঁপ দেব।”

তার পর সামিরের দিকে তাকাল।

চোখের ভাষায় কথা হলো দু’জনের।

“হ্যাঁ,” সামির বলল ধীরে,

“উনি যেভাবে বলেন—করো।”

সিনথিয়া জিজ্ঞাসা করল—

“আমি সফল হলে পুরস্কার কী?”

আলী বললেন—

“তোমাকে নিরাপদে সুবাক কেল্লায় ফিরিয়ে দেয়া হবে। এখানে সম্মানের সাথে রাখা হবে।”

মেয়েটা মাথা নেড়ে বলল—

“এটা খুবই নগণ্য। আমি বড় পুরস্কার চাই।

আমি মুসলমান হব।

আর আমাকে বিয়ে করবে সামির মাহতীর।”

সামির সঙ্গে সঙ্গে অস্বীকার করল।

আলী তাকে বাইরে ডেকে নিলেন।

“তোমাকে রাজি হতে হবে,” বললেন আলী।

“এটা কেবল বিয়ে নয়—রাষ্ট্রের স্বার্থ।”

সামির নিঃশ্বাস ফেলল—

“জানি সে মুসলমান হবে।

তবু তাকে ইসলামের শত্রুই মনে হয়।

কিন্তু ভবিষ্যৎ আমাদের হাতে নয়।

দীলের মালিক আল্লাহ।

সে হয়তো আমাকেও ছাড়িয়ে খাঁটি ঈমানদার হবে—কেউ জানে না।

 

 

পর্ব:০৮

দিলের মালিক আল্লাহ। ও ইসলামে ফিরে এলে শত্রুর বহু গোপন খবর আমরা জানতে পারব—আলীর কথাগুলো নীরবে শুনছিলেন সামির মাহতীর।

“বিয়ে তোমার ব্যক্তিগত পছন্দের বিষয়,” আলী আবার বললেন,

“তবুও দেশ ও জাতির স্বার্থে তোমাকে এই ত্যাগ স্বীকারের অনুরোধ জানাচ্ছি।”

গোয়েন্দা প্রধানের অনুরোধে অবশেষে মাথা নত করলেন সামির মাহতীর। দু’জনে আবার ভেতরে প্রবেশ করলেন।

সামির মেয়েটার দিকে তাকিয়ে ধীর কণ্ঠে বললেন—

“তোমাকে এখনও পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছি না। তবে তুমি যদি আমার জাতির জন্য ত্যাগ স্বীকার করতে পারো, আমার ধর্মের প্রতি অনুরাগী হও—তোমাকে বিয়ে করতে আমার আপত্তি নেই।”

মেয়েটা মুখ তুলে বলল—

“বলুন, কী করতে হবে। মুসলমানরা প্রতিশ্রুতি রাখে কি না—তা আমি নিজ চোখে দেখব। তবে… সে যেখানে যাবে, আমি সেখানে থাকব।”

আলী শর্তটি মেনে নিলেন। একজন অফিসারকে ডেকে তাদের থাকা-খাওয়ার আলাদা ও নিরাপদ ব্যবস্থা করতে নির্দেশ দিলেন। দরজা বন্ধ হতেই আলী বিন সুফিয়ান গোপন দায়িত্বের প্রতিটি দিক সামির মাহতীরের সামনে স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করলেন।

দেবতার আশ্রমে যাত্রা

তিন দিন পরে।

ছয় জন সৈন্য উটে চেপে বেরিয়ে পড়ল। পরনে সামরিক পোশাক, হাতে বর্শা ও তীরধনুক, কোমরে ঝুলছে ধারালো তরবারি।

সিনথিয়ার বর্ণনা অনুযায়ী আলী বিন সুফিয়ান তাদের এই বেশেই পাঠিয়েছিলেন।

দেবতার আশ্রমে ঢোকার মুখেই হঠাৎ—

শুঁss… ঠাস!

একটি বর্শা এসে তাদের পথের ঠিক সামনে মাটিতে গেঁথে গেল।

সৈন্যরা থমকে দাঁড়াল।

ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন আশ্রমের পুরোহিত। সাথে তিনজন কাফ্রী—সবার হাতে উঁচানো বর্শা।

একজন চিৎকার করে উঠল—

“তোমরা এখন আমাদের তীরন্দাজদের নিশানায়। সামান্য নড়াচড়া করলে তোমাদের প্রাণ রক্ষা পাবে না!”

তৎক্ষণাৎ মুসলিম সৈন্যরা কাফ্রীদের সামনে অস্ত্র ফেলে দিল। উট থেকে নামল।

দলনেতা এগিয়ে গিয়ে পুরোহিতের সামনে ঝুঁকে বলল—

“আমরা তোমাদের বন্ধু। বন্ধুত্ব নিয়ে এসেছি—বন্ধুত্ব নিয়েই ফিরব।

বলুন তো, তিনটি মেয়েকে বলি দেওয়ার কাজ শেষ হয়েছে কি?”

পুরোহিত ক্ষুব্ধ গলায় বলল—

“আমরা কোন মেয়ে বলি দেইনি! তোমরা এসব জানতে চাইছ কেন?”

সৈন্যপ্রধান উত্তর দিল—

“আমরা মিশরের বিদ্রোহী সৈন্য। মুসলমানরা তোমাদের দেবতাকে অপমান করেছে। এর প্রতিশোধ নিতে যে ফৌজ গঠিত হয়েছিল, আমরা সে দলের লোক। আমরা পরাজিত হয়েছি। তোমাদের অনুসারীরা বলেছিল—মেয়ে বলি সম্পন্ন না হওয়ায় দেবতা আমাদের অভিশাপ দিয়েছেন।”

“আমরা ছিলাম ফারুকের সঙ্গী,”—দলনেতা ধীরস্বরে বলল।

“একটার বদলে তিনটা ফিরিঙ্গি মেয়ে অপহরণ করে তার হাতে তুলে দিয়েছিলাম।

অনেক দূর থেকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে, লোভ দেখিয়ে ওদের এনেছি। ফারুক নিজ হাতে ওদের এখানে পৌঁছে দিয়েছে। গত পরশু ওর ফিরে যাবার কথা ছিল। সে ফিরে যায়নি। তাই দেখতে এসেছি—মেয়েদের বলি শেষ হয়েছে কিনা।”

দলনেতার কথা শুনে পুরোহিতের কঠিন মুখ গলে গেল।

“ফারুক আমাদের সাথে বজ্জাতি করেছে,” সে দাঁত চেপে বলল।

“মেয়েগুলো এনে তার নিয়ত খারাপ হয়ে গিয়েছিল। সে ওদের এখান থেকে ভাগিয়ে দেয়। কিন্তু আমরা তাকে পালাতে দিইনি।

ওর দেহটা কুমিরকে খাইয়েছি। আর মেয়েগুলো—আমাদের হাত থেকে পালিয়ে গেছে।”

এরপর ধীরে ধীরে এগিয়ে নিয়ে গেল সবাইকে।

মাটির তৈরি বিশাল এক ভাঁড়ের সামনে থামলেন পুরোহিত।

ঢাকনা সরিয়ে ভিতরে হাত ঢুকালেন।

ধীরে ধীরে উঠল তার হাত—

হাতে ফারুকের কাটা মাথা।

অক্ষত মুখ, আধখোলা চোখ, ঠোঁট বন্ধ।

মাথাটা ঔষধে ভিজিয়ে রাখা—নষ্ট না হয় বলে।

“ওর সঙ্গী দুটোকে জীবন্ত ঝিলে ছেড়ে দিয়েছি,” পুরোহিত বলল।

“আমাদের কুমির গুলো ক্ষুধার্ত ছিল।”

দলনেতা বলল,

“মাথাটা আমাদের দিতে হবে। আমরা আমাদের দলকে দেখাব—দেবতার অবমাননা করলে এই পরিণতি হয়।”

পুরোহিত মাথা হাতে তুলে দিল—তবে শর্তও জানাল,

“আগামীকাল সূর্যাস্তের আগে ফিরিয়ে দেবে। না দিলে তোমাদের মাথাও দেবতা নিয়ে নেবে।”

দুই দিন পর সৈনিকরা ফিরল।

সুলতান সালাউদ্দিনের পায়ের কাছে রাখল ফারুকের কাটা মাথা।

দীর্ঘক্ষণ চুপ করে রইলেন সুলতান।

চোখে ভারী ছায়া। মনে সন্দেহের ঝড়—

কাকে বিশ্বস্ত ভাববেন? কার ওপর ভরসা করবেন?

রাত গভীর।

নিজ কামরায় ঘুমিয়ে ছিলেন সামির মাহতীর।

পাশের বিছানায় শুয়ে আছে সিনথিয়া।

দুদিন ধরেই তার এক কথা—

“আমি মুসলমান হব। তুমি আমাকে বিয়ে করবে।”

সামিরের সোজা উত্তর,

“আগে কর্তব্য পালন করো।”

এই দূরত্ব দেখে সিনথিয়া কখনও মনে করেছে—ওকে ঠকানো হচ্ছে।

সামির স্পষ্ট করে বলেছিলেন—

“নীতি ও নৈতিকতার কারণেই তোমার কাছ থেকে দূরে থাকছি। এই নীতিই আমার ওয়াদা পালনে বাধ্য করবে। তুমি তোমার কাজ শেষ করো।”

কথাগুলো শুনে ধীরে ধীরে তার মনের ভয় ও সন্দেহ সরে গেল।

ফিরে এলো স্বাভাবিক চিন্তাশক্তি।

 

এক রাতে দুজন বারান্দায় শুয়ে।

বাইরে সেন্ট্রি টহল দিচ্ছে।

হঠাৎ—

সেন্ট্রির পেছনে কেউ নিঃশব্দে লাফিয়ে পড়ল।

মুখ কাপড়ে বেঁধে ফেলল। হাত বেঁধে ফেলল।

চারজন লোক এসে বাড়ির ফটকের পাশে দাঁড়াল।

একজন অন্যজনের কাঁধে পা রাখল—দেয়াল টপকাল।

ভিতর থেকে ফটক খুলে দিল।

তিনজন ঢুকে পড়ল।

একজন সিনথিয়ার মুখে কাপড় বেঁধে ফেলল।

তাকে তুলে নিল কাঁধে।

আরেকদল সামিরকে খাটের সাথে রশি দিয়ে শক্ত করে বাঁধল—

এক মুহূর্তও প্রতিরোধের সুযোগ পেলেন না তিনি।

বাইরে চারটি ঘোড়া প্রস্তুত ছিল।

মেয়েটাকে কম্বলে মুড়ে একজন ঘোড়ায় উঠল।

অন্যরা দ্রুত ঘোড়া ছুটিয়ে অন্ধকারের দিকে মিলিয়ে গেল।

শহর থেকে পাঁচ মাইল দূরে।

ফেরাউন আমলের পতিত, ভাঙা বাড়ি।

পাথরের টিলা কেটে তৈরি বহু কামরা—উপরে, নিচে, গলি সিঁড়ি, জটিল পথ।

জিন-ভূতের গল্পে মানুষ ভয় পায়—দিব্যি কেউ আসে না।

সবাই এ বাড়িকে ভূতের বাড়ি বলে জানে।

অপহরণকারীরা মেয়েটিকে ভিতরে নিয়ে গেল।

এমনভাবে হাঁটছিল যেন ওটিই তাদের বাড়ি।

মশালের আলোয় উড়ে পালাচ্ছে বাদুড়, টিকটিকি।

এদিক-সেদিক মাকড়সার জাল।

এক বিশাল পাথরের কামরায় ঢুকল ওরা।

মশালওয়ালা এক জায়গায় হাত রাখতেই মেঝের পাথর সরে গেল।

নিচে সুরঙ্গ পথ।

সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আরেক সুবিশাল কামরায়—

সাজানো শয্যা, চমৎকার চাদর, বিছানো ফরাশ।

সেখানে সিনথিয়ার মুখের কাপড় খুলে দিল ওরা।

সিনথিয়া চিৎকার করে উঠল—

“কেন এনেছো? কি চাও? মরব—তবুও কাউকে কাছে আসতে দেব না!”

একজন এগিয়ে এসে বলল শান্ত কণ্ঠে—

“এভাবে না আনলে ভোরে তোমাকে জল্লাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো। আমি ফয়জুল ফাতেমী।

তোমাদের আসার কথা ছিল আমার কাছেই।

ফারুক কোথায়? অন্য দুজন?”

সিনথিয়া ধীরে ধীরে সব খুলে বলল—

ঝড়, কাফ্রিদের আস্তানা, দুই মেয়ের মৃত্যু, সামিরের কাছে ধরা পড়া—সব।

ফয়জুল মনোযোগ দিয়ে শুনলেন।

মেয়েটাকে স্বান্ত্বনা দিলেন।

চার অপহরণকারীকে ছয়টা করে স্বর্ণমুদ্রা দিয়ে বিদায় করলেন।

একজন সেনা কমান্ডারকে সাথে রাখলেন।

যথাসময় হলে মেয়েটিকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাবেন—এই পরিকল্পনা।

সঙ্গীদের মৃত্যুর খবর শুনে তিনি দুঃখ পেলেও তা প্রকাশ করলেন না।

বললেন,

“ফারুককে বের করে আনতেই হবে।

সে সালাউদ্দিন ও আলীকে হত্যার ব্যবস্থা করেছে।

ঘাতক দলের সাথে কি চুক্তি হয়েছে—আমি এখনো জানি না।

এর দুজনকে যত দ্রুত সম্ভব সরাতে হবে।”

সিনথিয়া প্রশ্ন করল—

“সুলতান সালাউদ্দিন আপনাকে কতটা বিশ্বাস করেন?”

ফয়জুল শান্ত মুখে বলল—

“নিজের ব্যক্তিগত ব্যাপারেও  আমার সঙ্গে পরামর্শ করেন।”

সিনথিয়া বলল—

শুনেছি—উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে সুলতান সালাহউদ্দিন আয়ূবীর অনুগতই বহুগুণ বেশি; সেনাবাহিনীও তাঁর প্রতি সমভাবে বিশ্বস্ত।

সিনথিয়ার কথা শেষ হওয়া মাত্রই কমান্ডার উত্তর দিলেন,

—একথা ঠিক। তবে আরো জানো—সুলতানের গোয়েন্দা সংস্থা অসাধারণ সতর্ক; কোথাও সামান্য নড়াচড়া হলেও তারা টের পায়।

ঊর্ধ্বতন মহলে যারা সুলতানের বিরুদ্ধে কাজ করেছে, তাদের ব্যাপারে তোমাকে বলবেন সম্মানিত ফয়জুল ফাতেমী।

ফয়জুল ফাতেমী নামগুলো একে একে উচ্চারণ করে মৃদু হাসলেন।

তার চোখে ছিল রাজদরবারের অন্ধকার অলিগলিতে বিচরণ করা ষড়যন্ত্রের ঝিলিক।

—তোমাকে উচ্চ পর্যায়ের কাজ করতে হবে, বললেন তিনি।

—দু’জন প্রভাবশালী ব্যক্তির মধ্যে ভুল-বোঝাবুঝি সৃষ্টি করতে হবে; প্রয়োজনে বিষ প্রয়োগ করতে হবে। তোমার জন্য এসব কাজ কঠিন নয়। তবে জেনে রেখো—তোমাকে কোনো জলসা বা সভায় নেওয়া যাবে না। পর্দানশীন মুসলমান নারীদের মতো বোরকা না পরলে তুমি ধরা পড়ে যেতে পারো। অন্যথায় তোমাকে ফিলিস্তিন ফেরত পাঠিয়ে অন্য কোনো মেয়েকে আনতে হবে; তবে আশা করি তুমি যথেষ্ট বুঝদার, কোনো সমস্যাই হবে না।

তিনি থামলেন। তারপর নিচু গলায় আবার বললেন,

—আমার দল অত্যন্ত তৎপর, চৌকস—প্রায় সবাই কমান্ডার পর্যায়ের। যে চারজন সাহস করে তোমাকে তুলে এনেছে, তারা-ই আমার বিশ্বস্ত লোক। আমরা আয়ূবীর সেনাবাহিনীতে অস্থিরতা তৈরি করছি; জনতার মনে ফৌজের প্রতি ঘৃণার বিষ ছড়িয়ে দিচ্ছি।

তারপর চোখ নামিয়ে যেন নিজের সাফল্যের পরিমাণ পরিমাপ করলেন।

—সিরিয়া ও তুর্কি সৈন্যদের মানুষ সম্মানের চোখে দেখে। সুদানিদের পরাজয়ের পর শহরের বাসিন্দারা সেনাবাহিনীকে আরও শ্রদ্ধা করতে শুরু করেছে। এই অনুভূতিতে আঘাত করতেই হবে। অফিসারদের অপদস্থ করতে হবে। নইলে খ্রিস্টান কিংবা সুদানি—কেউই আমাদের প্রকৃত সহায়তা করবে না। কিছু পরিকল্পনা রয়েছে—কিন্তু এখনই সব বলা যাবে না।

সিনথিয়া নীরবে শুনছিল।

তার মুখে ভাবনা—এই নগরীর ভেতর-বাহির সে ইতিমধ্যে অনেকটাই বুঝেছে।

—এ কয়দিন বন্দিত্বে থেকে আমি বুঝেছি, বললো সে,

—এই কায়রোকে বহিরাগত কোনো শক্তি দমন করতে পারবে না। খ্রিস্টান সেনা বা সুদানি বাহিনী দুই দিক থেকে আক্রমণ করলেও তারা ব্যর্থ হবে। জনগণ নিজেই সৈন্যদের সাথে মিলেমিশে শহরকে দুর্গে পরিণত করবে; এমন দুর্গ যা জয় করা অসম্ভব।

ফয়জুল ফাতেমী গম্ভীর মুখে মাথা নেড়ে বললেন,

—ঠিকই বলেছ। কায়রো জয় করতে হলে আমাদের আগে

ময়দান তৈরি করতে হবে। মানুষের হৃদয়ে বিদ্বেষ ছড়াতে হবে, যুবকদের চরিত্র ধ্বংস করতে হবে। শুনেছি—দুই বছর ধরে এ কাজ চলছে। কিছু সফলতাও মিলেছে—বেহায়াপনা বেড়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্য—আইয়ুবী অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলেছে, খুতবা থেকে খলিফার নাম বাদ দিয়ে ইসলামের মূল শিক্ষা প্রচলিত করেছে। এমনকি মেয়েদেরও সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এর ফলে আমাদের বড় ক্ষতি হয়েছে।

এমন সময় বাইরে থেকে দ্রুত পায়ে ছুটে এল এক পাহারাদার।

—হুজুর, বাইরে সমস্যা দেখা দিয়েছে মনে হয়।

ফয়জুল ফাতেমীর মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।

মশাল নিভিয়ে তিনি পাহারাদারের পিছু নিলেন। বাইরে তখন ফাঁকা আকাশে ছড়ানো জোসনার স্নিগ্ধ আলো।

একটি উঁচু বেদীর আড়ালে দাঁড়িয়ে তিনি চারদিক তাকিয়ে দেখলেন।

—তোমরা যথেষ্ট সতর্কতার সাথে কাজ করোনি, তিনি ফিসফিস করলেন।

—সৈন্যরা বাড়ি ঘেরাও করে ফেলেছে। অশ্বারোহীও রয়েছে। দেখো কোনো দিক দিয়ে বেরোনোর পথ আছে কিনা—

কিন্তু পাহারাদাররা জানাল, সব দিক বন্ধ।

—আপনি ভিতরে যান। আলো জ্বালাবেন না। কেউ ভেতরে ঢুকতে চাইলে আমরা বাধা দেব। আপনি কক্ষ থেকে বের হবেন না।

ফয়জুল ফাতেমী ভূতুড়ে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেলেন।

এদিকে এক পাহারাদার দেয়ালের আড়াল বেয়ে নিঃশব্দে বাইরে চলে এল।

৫০ জন পদাতিক, প্রায় ২৫ জন অশ্বারোহী ঘিরে ফেলেছে পুরো বাড়ি।

ভিতরে তেমন কেউ নেই,

এই সংবাদ সরাসরি পৌঁছে দেওয়া হলো আলী বিন সুফিয়ানকে।

তার পাশে দাঁড়ানো ছিলেন কমান্ডার সামির মাহতীর।

পাহারাদার বলল, —ভিতরে যেতে আপনার সাথে দুইজনই যথেষ্ট। আমার অনুসরণ করুন।

আলী দুটি মশাল জ্বালালেন। হাতে উন্মুক্ত তরবারী। সামির ও চারজন সিপাইকে নিয়ে তিনি ভেতরে প্রবেশ করলেন।

ভেতরে পা দিতেই এক পাহারাদার ছুটে গেল অন্দরের দিকে।

 

 

পর্ব:শেষ

—ওরা নিজেদের সবাইকে সতর্ক করতে যাচ্ছে, বলল আলীর সঙ্গী পাহারাদার।

—তাড়াতাড়ি চলুন!

তাঁরা পিছু নিল।

বাড়ির আঁকাবাঁকা অন্ধকার পথগুলো যেন ধাঁধার মতো; সঙ্গী পাহারাদার না থাকলে সবাই পথ হারাত।

একদিক থেকে মানুষের দৌড়ানোর শব্দ আসলো। কারো ফিসফিস—

—আমি আগে যাচ্ছি, আপনাদের তাড়াতাড়ি আসতে হবে।

দলটি একটি পাথুরে কক্ষে পৌঁছালো। সেখান থেকে সিঁড়ি নিচে নেমে গেছে।

নিচে কেউ বলে উঠল,

—আমাদের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে! অপহরণকারীদের দু’জন ওদের লোক!

এরপরই শোনা গেল তলোয়ারে তলোয়ারের প্রচণ্ড সংঘর্ষ।

কেউ চিৎকার করল,

—ওকেও মেরে ফেলে দাও! যেন সাক্ষ্য দিতে না পারে!

আলী ও সামির সিঁড়ি লাফিয়ে নেমে এলেন।

নিচের কক্ষের মেঝেতে রক্তের রেখা ছড়িয়ে গেছে।

মেঝেতে বসে পেট চেপে ধরেছে সিনথিয়া—রেশমি এলোমেলো চুলে ঢাকা তারমুখ, নিঃশ্বাস ভারী।

এক কোণে য়জুল ফাতেমী ও তাঁর সঙ্গী কমান্ডার দু’পাহারাদারের সাথে লড়াই করছে।

বিপক্ষের তলোয়ারের ধার দেখে ফাতেমীর হাত কেঁপে গেল; তিনি অস্ত্র ফেলে দিলেন।

সামির দৌড়ে গিয়ে সিনথিয়ার পাশে বসলেন।

তার পেট ছিন্ন—রক্তে ভিজে আছে পোশাক।

সামির দ্রুত বিছানার চাদর ছিঁড়ে ব্যান্ডেজ করলেন।

—অনুমতি দিলে ওকে বাইরে নিয়ে যাই, কমান্ডার বললেন।

সিনথিয়াকে তিনি কোলে তুলে নিতেই মেয়েটি ব্যথা ভুলে দুর্বল হাসল।

—আমি আমার দায়িত্ব পালন করেছি… অপরাধীকে ধরিয়ে দিয়েছি…

অপহরণকারী দলের দু’জনসহ ফয়জুল ফাতেমীকে গ্রেপ্তার করা হলো।

বাকি দু’জন ছিল আলীর লোক।

ফ্ল্যাশব্যাক…..

সুলতান আইয়ুবী বলেছিলেন,

—খোঁড়া অজুহাতে কাউকে গ্রেপ্তার করা যাবে না। প্রমাণ ছাড়া কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ গ্রহণযোগ্য নয়।

সেই অনুযায়ী আলী বিন সুফিয়ান সিনথিয়ার কাছ থেকে তাদের গোয়েন্দাদের একটি গোপন পরিচিত সংকেত জেনে নিয়ে তিনজন চৌকস গুপ্তচর পাঠান ফাতেমীর কাছে।

তিনজনের একজন ছিল কমান্ডার। সংকেত ব্যবহার করে তারা ফাতেমীর সাথে দেখা করলো এবং বললো—

—একটি মেয়ে ধরা পড়েছে। তাকে নির্যাতন করা হচ্ছে। ফারুক আমাদের পাঠিয়েছেন তাকে উদ্ধার করতে।

ফয়জুল ফাতেমী বিষয়টি বিশ্বাস করলেন।

তিনি ভাবলেন—নির্যাতনের মুখে মেয়েটি হয়তো তাদের পরিচয় ফাঁস করে দিতে পারে। তাই আত্মরক্ষার্থে অপহরণের সিদ্ধান্ত নিলেন।

কমান্ডারকে নিজের দলেই রাখলেন।

আলীর পাঠানো দু’জনের সাথে আরও দু’জন সহযোগী মিলে চারজনকে অপহরণের দায়িত্ব দেওয়া হলো।

পরিকল্পনা অনুযায়ী রাতে সামির মেয়েটার পাশে বারান্দায় ঘুমালেন; পাহারায় ছিল একজন গুপ্তচর।

মধ্যরাতে পরিকল্পনা মতো ফাতেমী এসে পৌঁছালেন ভুতুড়ে বাড়িতে।

পাহারাদারকে অচেতন করে অপহরণকারীরা দেয়াল টপকে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

সামির ইচ্ছাকৃতভাবে ঘুমের ভান করে ধরা দিলেন।

মেয়েটাকে তারা ভাঙা বাড়িতে নেওয়ামাত্রই আলী এসে সামির ও পাহারাদারকে মুক্ত করলেন।

কিছুক্ষণের মধ্যে সৈন্যরা বাড়িটি ঘিরে ফেলল।

পুরো পরিকল্পনাই ছিল ফাতেমীকে হাতেনাতে ধরার জন্য অভিনীত এক নাটক।

ফাতেমী ও তার সহযোগীদের কারাগারে নিক্ষেপ করা হলো।

প্রত্যেককে দেখানো হলো ফারুকের কাটা মাথা।

—বন্ধুর পরিণাম দেখো—বললেন আলী।

—সব নাম বলার আগ পর্যন্ত শাস্তি চলবে—মরতেও দেব না, বাঁচতেও না।

রাত্রি নীরব, কায়রোর আকাশ শান্ত।

সিনথিয়া প্রচন্ড ব্যথা ও ক্লান্তির মাঝে শুয়ে আছে,

তার চোখে প্রতীক্ষা আর বিশ্বাস,

সামির তার পাশে শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে বসে আছে।

স্মৃতির পাতায় ভেসে বেড়াচ্ছে সিনথিয়ার সাথে দেখা হওয়া থেকে সব কথা।

সিনথিয়া ফিসফিস করে বলল—

“সামির, আমাদের বিয়ে আজই…আল্লাহর ইচ্ছেতে আজ থেকে তুমি আমার ”

সামির গভীর নিশ্বাস নিয়ে বলল—

“হ্যাঁ, সিনথিয়া। আল্লাহ আমাদের সাক্ষী।

আজ আমরা বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ হবো। ইনশাআল্লাহ।”

সুলতান সালাহউদ্দিন উপস্থিত হলেন সঙ্গে গোয়েন্দা প্রধান আলী এবং আরো কিছু সৈন্যের উপস্থিততে সম্পন্ন হলো সামির সিনথিয়ার বিয়ে।

সুলতান মৃদু হেসে বললেন—

“এই মুহূর্তে তোমাদের নিকাহ সম্পন্ন হলো।

জীবন হোক সংক্ষিপ্ত বা দীর্ঘ, আল্লাহর কাছে এই বন্ধন পবিত্র ও অটুট।”

সিনথিয়া সামিরের হাত শক্ত করে ধরল।

চোখে উজ্জ্বলতা, মুখে শান্তির হাসি।

“আমি শান্ত, তুমি আমার স্বামী। আল্লাহর কাছে আমাদের প্রতিশ্রুতি অটুট।”

সামির মৃদু স্বরে বলল—

দুনিয়ার পথচলা সংক্ষিপ্ত হলেও, জান্নাতে আমাদের সংসার চিরন্তন।”

সিনথিয়ার অবস্থা আশঙ্কাজনক হয়ে উঠলো।

চিকিৎসা চলল, কিন্তু তার প্রাণ ফিরে এলো না।

তবুও মুখে ছিল আশ্চর্য প্রশান্তি।

সিনথিয়া নিভু নিভু চোখে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললো—

—সামির, তুমি আমার পাশে বসে থাকো…

জীবনের এই শেষ সময়টুকু আমি তোমার সাথে কাটাতে চাই।

ইচ্ছে ছিল এক সাথে অনেকটা পথ চলার।

কিন্তু রব সে সুযোগ হয়তো আমায় দিবেন না।তাও আমার কোনো আপসোস নেই। রব আমায় যা দিয়েছে আমি তাতেই সন্তুষ্ট।

সুলতান নিজে তাকে দেখতে এলেন।

সামির উঠে দাঁড়াতে চাইলে সিনথিয়া তার হাত চেপে ধরল—

—না, উঠো না… আমার কাছে বসে থাকো।

সুলতান মৃদু হেসে বললেন,

—বসো, কমান্ডার।

তারপর সিনথিয়ার মাথায় হাত রেখে দোয়া করলেন।

তৃতীয় রাতে সিনথিয়া বলল—

—আমি আমার প্রতিশ্রুতি রেখেছি… তুমিও রেখেছ।

—আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করেছেন… নইলে তোমাকে আমার কাছে পাঠাতেন না।

—দুনিয়াতে তোমার সাথে সংসার হলো না… তবে জান্নাতে আমরা ছোট্ট একটা ঘর সাজাবো…

তার কণ্ঠ ভেঙে গেল।

সে সামিরের হাত শক্ত করে ধরল—ধীরে ধীরে তার দৃঢ়তা ঢিলে হলো।

সামির ফিসফিস করে বললেন,

—ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

পরদিন সুলতানের নির্দেশে মুসলমানদের কবরস্থানে তাকে সমাহিত করা হলে।

দু’দিন পর ফাতেমী ও তার সহযোগীরা সব নাম স্বীকার করতে বাধ্য হলো।

আটকের পর সুলতান ফাতেমীর মৃত্যুদণ্ডে স্বাক্ষর করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়লেন।

সন্ধ্যায় সামির মাহতীর গেলেন সিনথিয়ার কবরের পাশে।

দু’হাত তুলে দোয়া করলেন—চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ল নিঃশব্দ অশ্রু।

আকাশের দিকে তাকিয়ে তিনি বললেন—

—রব সর্বশ্রেষ্ঠ পরিকল্পনাকারী।

দুনিয়ার পথচলা তোমার সাথে এখানেই শেষ হলেও…

জান্নাতে আমাদের পথচলা হবে অনন্তকালের।

সময়ের স্রোতে পরে এই কবরটা হয়ে উঠবে এক নীরব স্মৃতি—

যেখানে বাতাস এলেই মনে হবে,

সিনথিয়া যেন ফিসফিস করে বলছে—

“সত্যকে রক্ষা করো… আর কাউকে প্রতারিত হতে দিও না।”

সামির কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল,

মরুর রাতে ক্লান্ত পথে

হঠাৎ এলে তুমি,

হয়নি বলা তুমিও ছিলে

আমার কাছে দামী!

সামির নিঃশব্দে, বিরবির করতে করতে পথ ধরে এগিয়ে গেল।

পেছনে একবারও ফিরে তাকাল না।

হৃদয় তাকে বারবার থামতে বলছিল—

কিন্তু সে দেশের সৈনিক;

মায়ায় থেমে থাকলে তার চলবে না।

সামির এগিয়ে গেল—

দূর, আরও দূর—

মরুর অন্ধকারকে চিরে

তার কর্তব্যের পথে।

কারণ তার জন্য পথ এখনো শেষ হয়নি।

 

~  সমাপ্ত~

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ ইচ্ছাশক্তি
Theme Customized By Shakil IT Park