
সাবিত রিজওয়ান
সময়ের ভাবনার দায়িত্বে থাকাকালীন মনেই হয়নি যে আমি প্রকাশক। মানুষকে বলে বেড়াইনি, আমি সম্পাদক নই, এমনকি আমি কাউকে বলতেও চাইনি যে আমি কবি।
যখন পঞ্চম শ্রেণীতে পড়তাম, একদিন ইসলাম শিক্ষা বিষয়ক শিক্ষিকা বলেছিলেন, “তুমি ভালো গল্প বলতে পারো, আমাদের শোনাবে না?” সেদিন একটি ইসলামিক গল্পের কয়েক লাইন বলছিলাম, কিন্তু ছুটি হওয়ায় তা আর শোনানো হয়নি। নানার বাড়িতে থাকতাম, প্রতিরাতে নানা গল্প বলতেন—রাজা-প্রজা, বন-বুড়ে, ভূত, নিজের জীবনকাহিনীও।
আমার গল্প লেখা কতকাল থেকে শুরু তা ঠিক বলতে পারি না, তবে গল্প দিয়েই সাহিত্যে প্রবেশ। যদিও ২০২২ সালে আমার প্রথম প্রকাশিত লেখা কবিতা ছিল। ষষ্ঠ-সপ্তম শ্রেণীতে ছোটদের জন্য কিছু গল্প লিখেছিলাম। ছোটবেলায় গল্পের বই পড়ার আগ্রহ ছিল, যদিও টাকার সংকটের কারণে বই কম কিনতে পারতাম। বাবার ফোন থেকে প্রচুর কার্টুন ভিডিও দেখতাম। কাজী নজরুল ইসলাম, জসিমউদদীন, জীবনানন্দ দাশ, সুকান্ত ভট্টাচার্য—আমার প্রিয় কবি। তাঁদের লেখা পড়তাম, মুগ্ধ হতাম, মাঝে মাঝে ভাবতাম, এত সুন্দর লেখা আমি কি লিখতে পারব কখনো?
আমি বিশ (২০) বয়সী কাউকে আহ্বান করব না সাহিত্যে প্রবেশ করতে। এই সময়গুলো স্কুল-কলেজে মনোনিবেশ করুক। এতে বই থেকে নয়, সমাজ থেকেও জ্ঞান অর্জন করবে। পরিশ্রমী হওয়া শিখুক, দাসত্বকে ভয় করা না শিখুক। তুমি অন্যদের দোকানের ক্রেতা, অন্যরা তোমার দোকানের ক্রেতা—এটাই শিখুক। সাহিত্যে প্রবেশের সময় হবে তখন, যখন ভয় থাকবে না, ইনকামের সুযোগ থাকবে। আমি ব্যর্থ, কিন্তু তারা যেন ব্যর্থ না হয়।
সাহিত্যচর্চায় পরিবারের কিছু মন্তব্য সহ্য করতে হয়েছে—”কাদের জন্য এসব করছিস? তারা কি তোকে খাওয়াবে? বাপের হোটেলে আর কতদিন থাকবি?” বাবাও বলে, “টাকা কামাই করবি কবে?” সাহিত্যে আমি এক টাকাও ইনকাম করতে পারিনি, বরং ব্যয় হয়েছে অনেক। তবে মনের অনুভূতি শেয়ার না করলে সাহিত্য হয় কিভাবে? সাহিত্যকে রাজনীতি বা ব্যবসার চোখে না দেখাটাই উত্তম।
প্রেমের কবিতা লিখতে তেমন আগ্রহ পাই না। কিছু নারী-পুরুষের আচরণের কারণে আমার রুচি নেই। আমি সবার থেকে ব্যতিক্রম। আমি প্রেম করেছি, কিন্তু যার সাথে করেছি, সে অন্য কারো প্রতি আসক্ত ছিল না। আমি প্রচণ্ড ভালোবাসি, কিন্তু বেইমানি হয়েছে। আমাদের পরিবারের মধ্যেও কিছু নারী-পুরুষ আছে, যাদের আমি পছন্দ করি না।
সাহিত্যে এসে দেখেছি কোনো কবির পাশে নেই। পাঠকদের মধ্যেও তেমন ভালোবাসা নেই। গ্রামে কখনো প্রশংসা পাইনি, শুনেছি বদনাম। আমি কোনো রাজনৈতিক দলের কবি হতে চাই না, সবার কবি হতে চাই।
আমি ২০২৫ সালে এসএসসি পাশ করেছি। কিন্তু মামা-মামীর প্রাধান্য মেনে পড়ালেখা করলে হয়তো শুধু দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়তে পারতাম। তারা পাঁচশো (৫০০) টাকার কাজ করিয়ে নিতো, খাওয়াতো বা দিতো মাত্র পঞ্চাশ (৫০) টাকা। কখনো সুবিচার দেখিনি। ভালোবাসা মানে পাঁচশো টাকার কাজ করিয়ে পঞ্চাশ টাকা দেওয়া নয়। মানুষের সময় ও শ্রমের মূল্য বোঝা উচিত। তারা পঞ্চাশ টাকা দিয়ে আটশো টাকার আঘাতের কথা শোনায়। তারা বাবা-মায়ের সেবা করে না, অথচ মাজারকে মানে বাবা। আমি মাজার পূজারীদেরও পছন্দ করি না।
সাহিত্যে প্রবেশের পথে বিভিন্ন বাধা—সমাজের স্বার্থপরতা, অর্থের প্রভাব, মানুষের অনীহা—সবকিছু দেখেছি। তবে বিশ্বাস করি, সাহিত্যে সত্যিকারের মূল্য পাওয়া যায় অধ্যবসায়, পরিশ্রম ও মনোযোগ দিয়ে।
আজকের কলামটিতে এসব অভিজ্ঞতা, হতাশা ও পর্যবেক্ষণ শেয়ার করেছি। সাহিত্যে প্রবেশ মানে কেবল লেখা নয়; এটি হচ্ছে মানুষের অনুভূতি, জীবন ও সমাজকে বোঝার এক চর্চা। আশা করি, নতুন প্রজন্ম সাহিত্যে প্রবেশ করবে সাহস, পরিশ্রম ও সততার সঙ্গে।
ইতি
সাবিত রিজওয়ান