
প্রতিবেদন ও ভ্রমণ পিপাসু- মোঃ নাছিম প্রাং
বাংলাদেশের ঐতিহাসিক স্থাপত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অন্যতম নিদর্শন হলো ধরাইল জমিদার বাড়ি। নাটোর জেলার সিংড়া উপজেলার ধরাইল গ্রামে অবস্থিত এই জমিদার বাড়িটি একসময় এলাকার সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু ছিল। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের টানে সম্প্রতি আমি ধরাইল জমিদার বাড়ি ভ্রমণের সুযোগ পাই, যা আমার জন্য ছিল এক স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
ভ্রমণের দিন সকালে আমরা সিংড়া থানার অন্তর্গত আগলাড়ুয়া গ্রাম থেকে সড়কপথে রওনা দিই। চারপাশে বিস্তীর্ণ সবুজ ধানক্ষেত, গ্রামীণ পরিবেশ আর শান্ত প্রকৃতি যেনো যাত্রাপথকে আরও আনন্দময় করে তোলে। গ্রামে প্রবেশের পর দূর থেকেই চোখে পড়ে জমিদার বাড়ির প্রাচীন অবয়ব। সময়ের ছাপ স্পষ্ট হলেও স্থাপনাটির আভিজাত্য এখনো অনুভব করা যায়।
ধরাইল জমিদার বাড়ির প্রধান ভবনটি লাল ইট ও চুন-সুরকির তৈরি। প্রবেশদ্বারের সামনে রয়েছে প্রশস্ত খোলা আঙিনা, যা একসময় বিভিন্ন উৎসব ও জমিদারি কার্যক্রমে ব্যবহৃত হতো। ভবনের দেয়ালে নকশা করা কারুকাজ, উঁচু স্তম্ভ ও প্রশস্ত বারান্দা দেখে সহজেই বোঝা যায় তৎকালীন জমিদারদের রুচি ও সৌন্দর্যবোধ কত উন্নত ছিল। ছাদের নকশা ও জানালার কাঠের কাজ আজও ইতিহাসের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ভেতরে প্রবেশ করে দেখা যায় বিভিন্ন কক্ষ, যেগুলো একসময় অতিথি আপ্যায়ন, দরবার বসানো ও পারিবারিক কাজে ব্যবহৃত হতো। কিছু কক্ষে এখনো পুরোনো দরজা, জানালার পাল্লা ও লোহার গ্রিল সংরক্ষিত আছে। যদিও অনেক জায়গায় সংস্কারের অভাব স্পষ্ট, তবুও প্রতিটি দেয়াল যেনো অতীতের গল্প শোনায়। লালোর উচ্চ বিদ্যালয়ের শিক্ষক মোঃ আব্দুল মতিন স্যারের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারি, ব্রিটিশ আমলে এই জমিদার বাড়ি ছিল এলাকার প্রভাবশালী কেন্দ্র, যেখানে বিচারকার্য ও সামাজিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হতো।
জমিদার বাড়ির পেছনে রয়েছে একাধিক বড় পুকুর। একসময় এই পুকুর ছিল জমিদার পরিবারের দৈনন্দিন ব্যবহার ও উৎসব আয়োজনের অংশ। পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে কল্পনায় ভেসে ওঠে সেই সময়ের ব্যস্ততা, নৌকা ভাসানো আর আনন্দমুখর পরিবেশ। চারপাশের নীরবতা আজ সেই অতীত গৌরবকে আরও গভীরভাবে অনুভব করায়। এবং সবচেয়ে ভালো লাগার বিষয় হলো ধরাইল রাজবাড়িটি এমন জায়গাতে অবস্থিত যা নাটোর জেলা ও সিংড়া থানার সীমানা জুড়ে।
ধরাইল জমিদার বাড়ি আমাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সামাজিক জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিচর্যার মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য টিকিয়ে রাখা অত্যন্ত জরুরি। ধরাইল জমিদার বাড়ি ভ্রমণ আমার মনে ইতিহাসের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও অতীত জানার আগ্রহ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।