1. admin@ichchashakti.com : admin :
মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ০১:৪৪ পূর্বাহ্ন

বিজয়ের হাসি, আমার বাবা

  • প্রকাশের সময় : বুধবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫
  • ৯৮ বার প্রতিবেদনটি দেখা হয়েছে

বিজয়ের হাসি, আমার বাবা  —- মাসুদ রানা 

 

১৯৭১ সাল—বাংলার ইতিহাসে এক অমর, অবিস্মরণীয়, রক্তস্নাত কিন্তু গৌরবময় বছর। বছরের শেষ মাস ডিসেম্বর এলেই আমার মনে পড়ে বাবার মুখ, তাঁর যুদ্ধশ্রান্ত চোখ, আর সেই রক্তমাখা সাদা জামাটা—যা আজও আমাদের ঘরে একটি ইতিহাস হয়ে ঝুলে আছে। বিজয়ের মাস যেন আমাদের বাড়িতে অন্যরকম এক শোক-আলোড়ন নিয়ে আসে; আনন্দও আছে, আবার গভীর কষ্টও আছে। কারণ স্বাধীনতার এই আলো পেতে আমাদের পরিবারও দিয়েছে এক অসীম ত্যাগ।

 

আমার বাবার নাম ছিল আবেদ আলী। তিনি ছিলেন একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা; শুধু মুক্তিযোদ্ধা নন, তিনি ছিলেন আমাদের সেক্টরের গেরিলা বাহিনীর একজন প্রধান সংগঠক। গ্রামের লোকেরা তাঁকে বলত—“আবেদ ভাই বাঘের মতো মানুষ।” কিন্তু আমার চোখে তিনি ছিলেন খুব শান্ত, ধীর, গভীর ভালোবাসায় ভরা একজন মানুষ। কিন্তু দেশ যখন ডাক দিল, তিনি সেই নরম মানুষটিকে শক্ত করে নিলেন দেশের জন্য।

 

যুদ্ধের বছর: বাবার রক্তমাখা জামা

 

১৯৭১ সালের মাঝামাঝি সময়। চারদিকে তখন আগুন, ধোঁয়া, লাশ, কান্না আর অত্যাচারের ভয়াল ছায়া। বাবা প্রতিদিন রাতে গেরিলা দলের ছেলেদের নিয়ে অপারেশন করতেন। কখনো সেতু উড়িয়ে দিতেন, কখনো পাকবাহিনীর রসদবাহী গাড়ি আক্রমণ করতেন, কখনো গ্রামের মানুষকে চুপচাপ নিরাপদ স্থানে সরিয়ে দিতেন।

 

একদিন ভোরে বাবা বাড়িতে ফিরলেন। মা দরজা খুলতেই দেখলেন—বাবার সাদা পাঞ্জাবি পুরো লাল। রক্ত যেন মাথা থেকে ঝরে এসে পুরো জামা রাঙিয়ে দিয়েছে। মা তখন চিৎকার করে উঠেছিলেন—

“আবেদ! তোমার রক্ত! তোমার কি হয়েছে?”

 

বাবা ক্লান্ত হাসলেন। বললেন,

“গোলার স্প্লিন্টার লেগেছিল। মানুষজন বাঁচাতে গিয়ে একটু আঘাত পেয়েছি। কিছু না। কিন্তু শোনো—আমরা ওদের রসদ নষ্ট করে এসেছি। এ যুদ্ধে আমরা জিতবই।”

 

মা তাঁর কাঁধে মাথা রেখে কাঁদলেন। আমি তখন ছোট… কিন্তু সেই রক্তমাখা সাদা জামাটা দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল—বাবার শরীরটা যেন দেশকে বাঁচাতে নিজেকে জ্বালিয়ে দিচ্ছে।

 

মা পরে সেই জামাটা খুব যত্নে ধুয়ে, শুকিয়ে, ভাঁজ করে বাসার এক পুরানো আলমারিতে তুলে রাখলেন। সেটাই আজও আমাদের পরিবারের অমূল্য সম্পদ—স্বাধীনতার স্মৃতি।

 

২৪ ঘণ্টার যুদ্ধ আর এক মৃতদেহের মতো ফিরে আসা

 

১৯৭১-এর শেষ দিকের কথা। তখন পাকবাহিনী শেষ দমে লড়ছে। একদিন টানা ২৪ ঘণ্টা যুদ্ধের পর বাবা প্রায় অজ্ঞান হয়ে বাড়িতে ফিরলেন। গ্রামের লোকেরা তাঁকে কাঁধে করে নিয়ে এল। তাঁর শরীরে একদিকে ক্ষত, অন্যদিকে চোট। বারুদ আর রক্তের মিশ্র গন্ধে মনে হচ্ছিল—তিনি যেন মৃত্যুকে জয় করে ফিরে এসেছেন।

 

বাবা সেই সময় বলেছিলেন,

“যদি আজকে বেঁচে থাকি, তবে শুধু স্বাধীনতাটার জন্য। দেশের লাল-সবুজ পতাকা উড়বে—এই আশায় আজও লড়ি।”

 

তিনি মারা যেতে পারতেন—কিন্তু বেঁচে গেলেন, কারণ দেশের স্বাধীনতা তখন মাত্র কয়েক দিনের দূরত্বে।

 

১৬ ডিসেম্বর: বিজয়ের হাসি

 

যেদিন বাংলাদেশ স্বাধীনতা পেল, সেই ১৬ ডিসেম্বরের সকালটি বাবা বলতেন তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় সুখের দিন। তিনি বলতেন,

“ওই দিন আমি প্রথমবার চোখ ভরে হাসছিলাম। মনে হয়েছিল, আমার বুকের রক্ত বৃথা যায়নি।”

 

বাবার সেই বিজয়ের হাসির ছবি এখনো আমার চোখে ভাসে। যুদ্ধের ক্লান্তি ছিল, ব্যথা ছিল, কিন্তু মুখে ছিল বিজয়ের আলো—যে আলো স্বাধীন জাতির জন্ম দেখেছিল।

 

স্বাধীনতার পর বাবার কষ্ট

 

যুদ্ধ শেষে বাবা মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে বিভিন্ন কাজ করতেন। কিন্তু বিজয়ের মাস এলেই তিনি চুপ হয়ে যেতেন। কখনো উঠোনে বসে, কখনো উঠোনের আমগাছের নিচে,শুধু জাতীয় পতাকার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতেন।

 

তিনি প্রায়ই বলতেন,

“স্বাধীনতা শুধু এক মাসের গান না। এটা আমাদের রক্তের ঋণ। এটাকে ভুলে গেলে জাতি হারিয়ে যাবে।”

 

বাবার কণ্ঠে গভীর বেদনা থাকত, কারণ তিনি তাঁর অনেক সহযোদ্ধাকে হারিয়েছিলেন। তিনি বলতেন—

“যারা ফিরে আসেনি, তারাই প্রকৃত বীর।”

 

১৯৯০: বাবার শেষ বিদায়

 

১৯৯০ সালের শীতে বাবা মারা গেলেন। মৃত্যুর আগের দিন তিনি আমাকে ডেকে বলেছিলেন—

“সাগর, মনে রেখো, স্বাধীনতা কাগজের কথা না। এটা তোমার বাবার রক্ত। আমার সহযোদ্ধাদের আত্মত্যাগ। তুমি দেশের প্রতি সৎ থাকবে—এইটাই আমার শেষ কথা।”

 

বাবার চোখে তখনো সেই বিজয়ের অশ্রু ঝিলমিল করছিল। তিনি চলে গেলেন, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া জামাটা, তাঁর গল্পগুলো, তাঁর কষ্ট—সব আজও আমাদের বাড়ির বাতাসে ভাসে।

 

বিজয়ের মাস এলে—বাবাকে ঘিরে আমার স্মৃতি

 

প্রতি বছর ডিসেম্বর এলে আমাদের ঘর ভরে যায় বিজয়ের গান, লাল-সবুজ পতাকা, স্কুলে অনুষ্ঠান, মিছিলে শ্লোগান। কিন্তু আমার কাছে বিজয়ের মাস মানে—বাবার গন্ধ, বাবার কণ্ঠ, বাবার রক্তমাখা সেই সাদা জামা।

 

আমি আলমারি খুলে সেই জামার দিকে তাকাই। অনুভব করি—

হয়তো এই রক্তেই আমার দেশ বেঁচে আছে।

হয়তো এই রক্তেই আমার ভাষা, আমার পতাকা, আমার আকাশ দাঁড়িয়ে আছে।

 

প্রতিবার আমি চুপচাপ জামাটা চোখে লাগাই। আর অঝোরে কাঁদি।

 

স্বাধীনতার কবিতার মতো বাবার গল্প

 

বাবা একবার বলেছিলেন—

“স্বাধীনতা মানেই মায়ের আঁচল নিরাপদ হওয়া।

শিশুর স্কুলে যাওয়ার পথে আর ভয় না থাকা।

বাবার খেতের ধান শান্তিতে বাড়া।

মেয়েদের হাসিমুখে খেলতে পারা।

স্বাধীনতা মানে—বঙ্গের মানুষের সম্মান।”

 

আজ যখন বিজয়ের গান বাজে, আমি মনে মনে বাবার সেই কথাগুলো শুনি—

 

স্বাধীনতা তুমি বাংলার আকাশে বাতাসে।

স্বাধীনতা তুমি রোদেলা আকাশ ভরা দুপুরে।

স্বাধীনতা তুমি বাবার স্বপ্ন, মুক্ত করেছে দেশ।

স্বাধীনতা তুমি বাবার দেশ থেকে পাকবাহিনীর শেষ।

স্বাধীনতা তুমি মায়ের আঁচল—শিশুর নিরাপদ পথ।

স্বাধীনতা তুমি স্কুলমুখী হাসিমাখা শিশুর গল্প।

 

বাবার রেখে যাওয়া শিক্ষা

 

আজ এত বছর পরও আমি বুঝি—

বাবার আসল বিজয় ছিল তাঁর ত্যাগ, তাঁর মানবতা, তাঁর দেশের প্রতি অন্তহীন ভালোবাসা।

 

তিনি আমাকে শিখিয়েছেন—

 

“দেশ শুধু মানচিত্র না, দেশ মানে মানুষ;

মানুষের সম্মান, মানুষের নিরাপত্তা, মানুষের স্বাধীনতা।”

 

বিজয়ের মাস আমাকে শুধু আনন্দ দেয় না, আমাকে শক্তিও দেয়। বাবার হাসি, তাঁর রক্তমাখা জামা, তাঁর রেখে যাওয়া স্মৃতি—সব আমাকে মনে করিয়ে দেয়—

 

স্বাধীনতা আমাদের গর্ব।

স্বাধীনতা আমাদের দেশ।

স্বাধীনতা আমাদের বাবাদের রক্তে লেখা ইতিহাস।

 

আর আমি—বাবার সন্তান সাগর—আজও বিজয়ের মাস এলে দাঁড়িয়ে থাকি সেই আলমারির সামনে, বাবার জামার সামনে, আর মনে মনে বলি—

 

“বাবা, তুমি যে স্বাধীনতা এনেছিলে

আমরা তা রক্ষা করব—প্রাণের বিনিময়ে হলেও।”

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ ইচ্ছাশক্তি
Theme Customized By Shakil IT Park