
আল-মামুন রেজা
শীত এলেই ফাহিমের মনে ভেসে ওঠে তার শৈশবের সেই গ্রাম—যেখানে প্রতিটি ভোর যেন নতুন গল্প নিয়ে শুরু হতো। এখন শহরের উঁচু দালান আর ধোঁয়ার ভিড়ে থাকলেও শীতের কুয়াশা তাকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় সেই স্মৃতিময় দিনে, যেখানে প্রকৃতি ছিল শিক্ষক, পরিবার ছিল আশ্রয়, আর প্রতিটি মানুষ ছিল যেন একেকটি গল্প।
শীতের সকালে যখন মোরগের ডাক আর মায়ের বানানো চিতই,ভাপা পিঠার মিষ্টি গন্ধে তার ঘুম ভাঙতো সবচেয়ে মজার ছিল উঠোনে চুলার পাশে বসে মায়ের হাতের সদ্য বানানো নানা রকম মিঠে ধোঁয়ার পিঠা খাওয়া আর পাটালি গুড়ের মিষ্টি গন্ধে যেন গোটা বাড়িটাই উষ্ণ হয়ে উঠত। মা বলতেন,
—“শীত যতই কঠিন হোক, পরিবার একসাথে থাকলে সব উষ্ণ হয়ে যায়।”
ফাহিম আর ফাহমিদা আগুনের পাশে হাত পেতে বসত গরম গরম সব পিঠা খেতে । শীতের সকালের এই মুহূর্তগুলো আজও তার হৃদয়ে উজ্জ্বল।
গ্রামের মানুষের জীবন ছিল শীতেও থেমে না থাকা এক পরিশ্রমের যাত্রা। প্রতিবেশী করিম চাচা শীতে কুয়াশায় ভিজে যাওয়া পথ ধরে খুব ভোরেই ক্ষেতে চলে যেতেন। চাচার মুখে ফাহিম শুনত—
—“শীতের সময় অলস হলে চলবে না, ভাই। এ সময়ের কাজ ফসলের ভবিষ্যৎ ঠিক করে।”
এই বাক্যটি ফাহিম বড় হয়েও মনে রেখেছে। কারণ শীতের সকালে করিম চাচাকে যতবার দেখেছে, ততবার শিখেছে—পরিশ্রমের কোনো ছুটি নেই।
ফাহিমের দাদু ছিলেন অভিজ্ঞ কৃষক। তার সাথে ক্ষেতের সোনালি সরষে ফুল দেখতে যাওয়া ছিল ফাহিমের শীতকালের বিশেষ আনন্দ। কুয়াশা সরলে যখন সূর্যের আলো সরষে ক্ষেতে পড়ত, তখন মনে হতো মাঠ যেন হলুদের চাদর পেতে আছে। দাদু নরম কণ্ঠে বলতেন,
—“দেখিস, প্রকৃতি কখনো কাউকে ঠকায় না। সময়মতো যত্ন দিলে সে তার সৌন্দর্য আর ফল দিয়ে ফিরিয়ে দেয়।”
শীতের ফসল—মটরশুঁটি, আলু, বাঁধাকপি, লাউ,শীম ধীরে ধীরে গড়ে ওঠা দেখে ফাহিম বুঝেছে—জীবনের প্রতিটি সাফল্য সময়, ধৈর্য আর নিয়মিত যত্নে তৈরি হয়।
শীতের প্রকৃতিও ছিল অন্যরকম সুন্দর। পুকুরের ধারে বরফশীতল কুয়াশায় মোড়া সকাল, মাঠের উপর শিশিরবিন্দুর ঝিকিমিকি, তারার মতো ঝলমলে শিমুল-কাঠগোলাপ ফুল, আর দূরে পাখির সুর—সব মিলিয়ে শীত ছিল যেন ছোটদের জন্য এক উৎসব। দোয়েল, শালিক, টিয়া আর বউ কথা কও মিলেমিশে গ্রামের সকালকে সাজিয়ে তুলত। ফাহিম প্রায়ই ভাবত—পাখিরা মানুষকে শিখায় স্বাধীনভাবে বাঁচা আর প্রতিটি সকালকে নতুন করে শুরু করার সাহস।
শীত মানেই গ্রামে পিঠা উৎসব। বিকেলবেলায় প্রতিবেশী আনোয়ারা খালা, সালমা আপা সবাই মিলে উঠোনে বসে পিঠা বানাতেন। ফাহিম তাদের হাসিঠাট্টা শুনে বুঝত—মানুষের সুখ একা নয়, একসাথে ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই লুকানো।
তবে দাদুর বলা একটি কথা ফাহিমকে আজও পথ দেখায়।
দাদু বলেছিলেন,
—“মানুষের জীবনে শীতের মতো সময় আসবে। কখনো কঠিন দিন, কখনো অনিশ্চয়তা, কখনো হতাশা। কিন্তু মনে রাখিস, শীত যতই দীর্ঘ হোক, বসন্ত ঠিকই আসে। যে ধৈর্য রাখে, সে-ই আলোর দেখা পায়।”
ফাহিম বুঝেছে—দাদু শুধু প্রকৃতির কথা বলেননি, জীবনের মানে বোঝাতে চাইতেন।
আজ যখন ফাহিম শহরে ব্যস্ততার মাঝে দাঁড়িয়ে কুয়াশা দেখে, শীতল বাতাস গায়ে লাগে, তখন মনে পড়ে— তার শৈশবের শীত শুধু আনন্দ বা পিঠা ছিল না; ছিল জীবনের মূল শিক্ষা। পরিশ্রম, ধৈর্য, পরিবার, প্রকৃতি—সব মিলিয়েই মানুষ দৃঢ় হয়ে ওঠে।
শীত তাকে শিখিয়েছে—
স্মৃতি একজন মানুষকে উষ্ণ করে, আর শিক্ষা তাকে শক্ত করে।