
কবি ও সাংবাদিক আনোয়ার হোসেন রনি,
বাংলার ইতিহাসে কিছু নাম থাকে, যারা প্রচারের আলোয় নয়, কর্মের দীপ্তিতে অমর হয়ে থাকেন। তারা গর্জন করেন না— কিন্তু ইতিহাসের বুক চিরে রেখে যান প্রতিরোধের অমোঘ স্বাক্ষর। বিপ্লবের রক্তগোধূলিতে, জাতীয় চেতনার উত্থানে, স্বাধীনতার প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষায় যারা আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছেন, তাদের অন্যতম ছিলেন ফজলুল হক সেলবর্সী— একাধারে সাংবাদিক, লেখক, ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবী, রাজনীতিক এবং কলমসেনা।
১৮৯৩ সালে সুনামগঞ্জ জেলার ধরমপাশা উপজেলার সেলবরস গ্রামে তাঁর জন্ম। সেটাই তাঁর পরিচয়ের ভিত্তি— এবং নামের শেষে “সেলবর্সী” প্রতীক হয়ে দাঁড়ায় মাটির সাথে তাঁর গভীর সম্পর্কের। অথচ জন্মের কয়েক বছরের মধ্যেই জীবনের প্রথম অভিঘাত— পিতামাতাকে হারিয়ে তিনি হয়ে ওঠেন অনাথ, অসহায়। শৈশবের এই বেদনা হয়তো পরবর্তীতে তাকে আরও দৃঢ়, আরও নিষ্ঠাবান এবং আরও বিদ্রোহী করে তোলে।
শিক্ষাজীবন: সংগ্রামের মধ্যেই আলোর সন্ধান
তাঁর শিক্ষাজীবন কখনই মসৃণ ছিল না। জীবন সংগ্রামের টানাপড়েনে যখন টিকে থাকার লড়াই-ই প্রধান হয়ে ওঠে, তখন শিক্ষার আলো পাওয়া ছিল এক কঠিন ব্যাপার। তবুও ১৯১৫ সালে তিনি সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত ছিলেন। ঠিক এই সময়েই তাঁর জীবনে ঘটে নতুন মোড়— কলকাতার দিকে যাত্রা।
কলকাতা তখন বাঙালি মুসলমানদের রাজনৈতিক জাগরণ, সাহিত্যচর্চা এবং বিপ্লবী আন্দোলনের উর্বর ক্ষেত্র। ১৯১৬ সালে সেখানে ম্যাট্রিক পাস করে তিনি ভর্তি হন রিপন কলেজে। কিন্তু ফজলুল হক শুধু বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ থাকার মানুষ ছিলেন না। তাঁর মনের ভিতর তখন ফুঁসে উঠছে সময়ের আলোড়ন, উপনিবেশবিরোধী ঝড়। তাই অচিরেই কলেজ ছেড়ে তিনি যাত্রা করেন এমন এক পথের দিকে— যার অস্তিত্ব তখনো তিনি স্পষ্টভাবে জানতেন না, তবু অনুভব করতেন তা ছিল তাঁর নিয়তি।
সাংবাদিকতার অনন্য অভিযাত্রা ১৯১৭ সাল। তিনি যোগ দেন সাপ্তাহিক মোহাম্মদী পত্রিকায়। এই যোগদান কেবল একটি চাকরির সূচনা নয়— এটি ছিল তাঁর বিপ্লবী চিন্তা, রাজনৈতিক বোধ এবং সাহসী কলমের প্রকাশের দরজা খুলে দেওয়ার প্রথম পদক্ষেপ। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর প্রতিভা, সততা এবং নির্ভীকতা তাঁকে নিয়ে আসে সম্পাদনার জগতে।
তিনি সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন—দৈনিক নবযুগ,সাপ্তাহিক মোহাম্মদী,সাপ্তাহিক আল-মুসলিম,সাপ্তাহিক যুগভেরী,সাংবাদিকতা তাঁর কাছে ছিল শুধু পেশা নয়— ছিল অস্ত্র। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ, জাতীয় ভাবধারার জাগরণ, মুসলিম সমাজজীবনের উন্নতি এবং ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে মেধাবী প্রতিরোধ— এই সবই তিনি খুঁজে পেতেন কলমের ভিতরে।
১৯৩৫ সালে তিনি সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন দৈনিক তাকবির পত্রিকায়। কিন্তু পত্রিকাটি অচিরেই সরকারের রোষানলে পড়ে। কারণ— সেলবর্সীর কলম ছিল ভয়হীন, আপসহীন। কোনো সত্য তিনি আড়াল করতেন না, আর অন্যায়ের সামনে মাথা নোয়াতেন না। ফলে ব্রিটিশ সরকার পত্রিকাটি বন্ধ করে দেয়।
কিন্তু ফজলুল হক থেমে থাকেননি। এরপর তিনি যুক্ত হন—দৈনিক সোলতান,দৈনিক মুসলিম
নয়াবাংলা,আল-এসলাম,১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির পর তিনি ঢাকায় চলে আসেন এবং দীর্ঘদিন কাজ করেন দৈনিক সংবাদ এবং নেজামে ইসলাম পত্রিকায়। তিনি ছিলেন সাংবাদিকতার সেই প্রজন্মের প্রতিনিধি, যারা সংবাদকে কেবল খবর নয়— জাতির উত্থানের হাতিয়ার মনে করতেন। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম: বিপ্লবের মাটিতে এক অগ্নিপুরুষ ফজলুল হক সেলবর্সীর নাম উচ্চারিত হয় উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ এক অধ্যায়ে।
তিনি শুধু লেখক বা সম্পাদক হিসেবে ব্রিটিশবিরোধী অবস্থান নেননি— তিনি সরাসরি বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। ১৯২১ সালে রাষ্ট্রদ্রোহ ও ব্রিটিশবিরোধী কার্যক্রমের অভিযোগে তাঁর নামে পর পর তিনটি গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তিনি আত্মগোপনে চলে যান। গোপন ঘাঁটি থেকে তিনি বিপ্লবীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করেন, পরিকল্পনা করেন, আর আন্দোলনের বারুদে নতুন আগুন যোগান।
কিন্তু তাঁর সংগ্রাম ছিল কেবল পালিয়ে থাকার সংগ্রাম নয়— এটি ছিল স্বাধীনতার প্রতি দৃঢ় অঙ্গীকার। আফগানিস্তানের পথে: বিপ্লবের নিরাপদ আশ্রয় মওলানা আবুল কালাম আজাদের প্রণোদনায় ১৯২২ সালে তিনি বাংলা ত্যাগ করেন। গন্তব্য— আফগানিস্তান। কারণ আফগানিস্তান তখন ব্রিটিশবিরোধী বিপ্লবীদের জন্য তুলনামূলক নিরাপদ দেশ। সেখানে দাঁড়িয়ে উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যুক্ত থাকা ছিল অনেক বিপ্লবীর কৌশলগত পরিকল্পনা।
কিন্তু ইতিহাস তার জন্য অন্য পথ নির্ধারণ করে রেখেছিল। আফগানিস্তান থেকে পেশোয়ারে যাওয়ার পথে সীমান্তে তিনি গ্রেফতার হন। তাঁকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় পেশোয়ার সেনানিবাসে।
৪৮ দিনের অন্ধকার: এক অবিনশ্বর মানসের পরীক্ষা পেশোয়ার সেনানিবাসে তাঁকে রাখা হয় একটি অন্ধকার প্রকোষ্ঠে— ৪৮ দিন ধরে। আলোহীন, বন্ধ ঘর। বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন, নির্যাতনের ভয়, মৃত্যুর আশঙ্কা— কিন্তু কোথাও কোনো ভাঙন নেই তাঁর ভিতরে।
কলমের মানুষ, চিন্তার মানুষ, আদর্শের মানুষ— এই ৪৮ দিন তাঁর ভেতরের বিপ্লবী সত্তাকে আরও শক্ত করে। পরে তাঁকে সিলেটে এনে বিচার করা হয়। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে তাঁকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়। ১৯২৪ সালে তিনি মুক্তি পান।
লেখনী: বিপ্লবের বার্তা ফজলুল হকের অসংখ্য রচনা, নিবন্ধ, অনুবাদ এবং সম্পাদকীয় ছড়িয়ে ছিল বিভিন্ন সাময়িকীতে।
তাঁর লেখায় ছিল তীক্ষ্ণ চিন্তা, যুক্তি, ধর্মীয়-সামাজিক পুনর্জাগরণ এবং ব্রিটিশবিরোধী বার্তা।
তাঁর বিপ্লবী রচনা সবচেয়ে বেশি প্রকাশিত হয় কাজী নজরুল ইসলামের ধূমকেতু পত্রিকায়। ধূমকেতু তখন বিদ্রোহের প্রতীক, আর সেলবর্সী ছিলেন সেই আগুনের অন্যতম যোগানদাতা।
তাঁর দুইটি গ্রন্থ রচিত হলেও সেগুলো অপ্রকাশিত অবস্থায় থেকে যায়— যা বাংলা সাহিত্যের জন্য বড় ক্ষতি। নজরুলের ঘনিষ্ঠজন: বিদ্রোহী মানস গঠনে অনস্বীকার্য ভূমিকা কাজী নজরুল ইসলামের বিপ্লবী মানস গঠনে ফজলুল হক সেলবর্সীর প্রভাব গভীর। তাঁদের সম্পর্ক ছিল শুধু পেশাগত নয়— ছিল মানসিক, আদর্শগত, সংগ্রামী বন্ধন।
নজরুলের বিদ্রোহী চেতনা, উপনিবেশবিরোধী অবস্থান, মুসলিম সমাজের সংস্কারবাদ— এসবের পাশে ছিল সেলবর্সীর ভাবধারা, আলোচনা এবং পরামর্শ। ইতিহাসের পাতায় নজরুলের নাম উজ্জ্বল, আর তার পাশে নীরবে দাঁড়িয়ে আছে— ফজলুল হক সেলবর্সী। গণসংবর্ধনা ও বিদায়
১৯৬৭ সালের ২৬ এপ্রিল সুনামগঞ্জ সাহিত্য মজলিশ তাঁকে গণসংবর্ধনা প্রদান করে। জীবনের দীর্ঘ সংগ্রামের পর এই সম্মান ছিল তাঁর প্রাপ্য স্বীকৃতি। এক বছর পর— ১৯৬৮ সালের ৮ নভেম্বর তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন। কিন্তু তিনি মরে যাননি। তাঁর লেখা, তাঁর বিপ্লবী সাহস, তাঁর সাংবাদিকতা, তাঁর সততা— আজও বেঁচে আছে ইতিহাসের পাতায়, সময়ের স্মৃতিতে, স্বাধীনতার চেতনায়।
সেলবর্সীর জীবন আমাদের কী শিখায়?
অভাব বাধা নয়— প্রেরণা। কলম শুধু লেখা নয়— অস্ত্র। স্বাধীনতার স্বপ্নে আপস নেই। অন্যায় ও শোষণের কাছে মাথা নোয়ানো মানেই মৃত্যু।
নীরব জীবনেও ইতিহাস লেখা যায়। ফজলুল হক সেলবর্সী ছিলেন না প্রভাবশালী জমিদার, বিখ্যাত রাজনীতিক বা ক্ষমতাবান ব্যক্তি। তিনি ছিলেন সাধারণ এক বাঙালি, কিন্তু তাঁর চিন্তা ছিল অসাধারণ। তিনি ছিলেন নিঃসঙ্গ যোদ্ধা, কিন্তু তাঁর শব্দ ছিল জনতার ভাষা। তিনি ছিলেন নিঃস্ব, কিন্তু আদর্শে ছিলেন অগাধ সম্পদের মালিক।
যে মানুষটি শৈশবে পিতামাতাকে হারিয়েও থেমে যাননি, কারাগারের অন্ধকারেও মাথা নত করেননি, পত্রিকা বন্ধ হলেও কলম ফেলে দেননি— সেই মানুষটিই আজ ইতিহাসের এক অবিচ্ছেদ্য অধ্যায়। ফজলুল হক সেলবর্সী আমাদের শেখান—
“একজন নির্ভীক মানুষের কলম, হাজার সৈন্যের সমান শক্তিশালী।” তিনি স্মরণীয়। তিনি বরণীয়।
তিনি অগ্নিযুগের এক অমর নায়ক।