
জেড এইচ ফাহাদ
আবু বক্কর গ্রামে তাদের দাদুর বাড়ীতে এসেছে। তার দাদু গ্রামে থাকেন। সাথে তার চাচা ও জেঠারাও থাকেন। আবু বক্কররা দুইভাই, তসর থেকে তিন বছরের ছোট রাফি। তার চাচার তিন মেয়ে সাদিয়া,নাদিয়া ও মালিহা। সাদিয়া আবু বক্কর এর সমবয়সী। আর তার জেঠার এক ছেলে ও মেয়ে। ছেলেটা আবু বক্করের সাথে আর মেয়েটা ছোট। আবু বক্কর এবার পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ে।
গ্রামের বাড়ীতে আসলেই রাতে সবাই মিলে তার দাদার কাছে গল্প শুনে। তার দাদা বিভিন্ন ধরনের গল্প বলেন তাদের। যা তাদের আনন্দ দেওয়ার পাশাপাশি শিক্ষাও দেয়। আজও তাই হলো, সবাই মিলে দাদর রুমে গিয়ে উপস্থিত। তাদের দেখে দাদাও খুশি। “দাদা ভাই! আজকে হযরত মুহাম্মদ (স.) এর জীবনী নিয়ে কথা বলুন। আমি তার জীবনী শুনতে চাই।”, সাদিয়া বলে। বাকিরাও রাজি হয়। দাদা বলেন,“ ঠিক আছে।তহলে শুরু করা যাক বাচ্চারা। আরব যখন চরম জাহিলিয়াতে নিমজ্জিত তখন আরবের কুরাইশ বংশে ৫০৭ খ্রিস্টাব্দে মাহানবি হযরত মুহাম্মদ (স.) জন্মগ্রহন করেন। তিনি আমাদের প্রিয় নবি। তোমরা কি কেউ তাঁর সম্পর্কে একটু বলতে পারবে?”“জী,আমি পারবো। তাঁর পিতার নাম আব্দুল্লাহ ও মাতার নাম আমিনা। তাঁর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তাঁর নাম রাখেন মুহাম্মদ ও তাঁর মা নাম রাখেন আহমদ।
এছাড়া তাঁর নানার নাম ছিল ওয়াহাব। তাঁর জন্মের পূর্বে তাঁর পিতা মারা যান। আর তাঁর মা ছয় বছর বয়সে মারা যান। তাঁর মা-বাবার মৃত্যুর পর তার দাদা তার দেখাশোনা করেন। ”আকবর বলে।“ধন্যবাদ তোমাকে, দাদুভাই। তবে তুমি কিছু কথা বাদ দিয়েছো। তাঁর জন্য এরপর তাঁকে এক ধাতুর কাছে লালন পালনের জন্য দিয়ে দেওয়া হয়।তাঁর ধাত্রী মায়ের নাম ছিল হালিমা। হালিমা বনু সাদ গোত্রের লোক ছিলেন। বনু সাদ গোত্রের লোকেরা বিশুদ্ধ আরবিতে কথা বলতো। যার ফলে মুহাম্মদ (স.)ও বিশুদ্ধ আরবিতে কথা বলেন। শৈশবকাল থেকে মহানবি (স.) এর মাঝে ন্যায় ও ইনসাফের নজির দেখা যায়। তিনি তাঁর ধাত্রী মায়ের একটি স্তন পান করতেন অন্যাটি তাঁর দুধভাইয়ের জন্য রেখে দিতেন। হালিমা মহানবি (স.)কে পাঁচ বছর লালন-পালন করে তাঁর মা আমিনার নিকট রেখে যান। এরপর তাঁর মা মারা যান। আর দাদা মারা যান আট বছর বয়সে। তারপর তাঁর চাচা আবু তালিব লালন-পালন শুরু করেন। চাচা আবু তালিব আর্থিক অবস্থা ছিল অসচ্ছল। তিনি মুহাম্মদ (স.)কে স্নেহ দিয়ে লালন-পালন করতে থাকেন। মহানবি (স.) এ অবস্থা অবলোকন করে চাচার সহযোগিতায় কাজ শুরু করেন। তিনি মেষ চরাতেন।
মেষপালক রাখাল বালকদের জন্য তিনি ছিলেন উত্তম আদর্শ। তাদের সাথে তিনি বন্ধুত্বপূর্ণ আচরন করতেন। তিনি ১২বছর বয়সে ব্যবসার উদ্দেশ্য চাচার সঙ্গে সিরিয়া যান। যাত্রা পথে ‘বুহায়রা’ নামক এক পাদ্রির সাথে দেখা হলে বুহায়রা মুহাম্মদ ( স.)কে অসাধারণ বালক বলে উল্লেখ করেন। এবং ভবিষ্যদ্ধাণী করে বলেন যে ‘এ বালকই হবে আখেরি নবি।’ শৈশব থেকে মুহাম্মদ (স.) সত্যবাদী ও শান্তিকামী ছিলেন। সিরিয়া থেকে ফিরে এসে তিনি ফিজার যুদ্ধের বিভিষীকা দেখেন। যুদ্ধটি শুরু হলো নিষিদ্ধ মাসে। এছাড়াও কাগজ গোত্র অন্যায় ভাবে কুরাইশদের উপর এই যুদ্ধে চাপিয়ে দিয়েছিল।এইজন্য একে ‘হারবুল ফিজার’ বা অন্যায় যুদ্ধ বলা হয়। পাঁচ বছর পর্যন্ত এই যুদ্ধ স্থায়ী হয়। হযরত মুহাম্মদ (স.) এই যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেননি। তবে যুদ্ধের ভয়াবহ তাঁর কোমল হৃদয়কে আঘাত করে। শান্তিকামী মানুষ হিসেবে এ অশান্তি তাঁর সহ্য হলো না। তাই তিনি আরবের শান্তিকামী যুবকদের নিয়ে ‘ হিলফুল ফুজুল ’ ( শান্তি সংঘ) গঠন করলেন। এই সংঘের উদ্দেশ্য গুলো কি কেউ বলতে পারবে? ”“ এ সুংঘের উদ্দেশ্য ছিল আর্তের সেবা, অত্যাচারীকে প্রতিরোধ ও অত্যাচারিতকে সাহায্য করা, শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা এবং গোত্রের গোত্রের শান্তি, সম্প্রীতি বজায় রাখা।তুমি কি আমাকে নবুয়ত প্রাপ্তির ঘটনা বলবে? ”“ আচ্ছা তাহলে শোনো। হযরত খাদিজা রাদিয়াল্লাহু এর সাথে বিবাহের পর হযরত মুহাম্মদ (স.) অদূরে হেরা পর্বতের গুহায় গভীর ধ্যান মগ্ন থাকতেন। দীর্ঘদিন ধ্যানে মগ্ন থাকার পর ৪০ বছর বয়সে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে পবিত্র রমজান মাসের কদরের রাতে হযরত জিবরাঈল (আ.) তার নিকট ওহি নিয়ে আসেন এবং তিনি নবুয়ত প্রাপ্ত হন। জিবরাইল (আ.) বলেন,‘পড়ুন আপনার প্রভুর নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।’( সূরা আল-আলাক, আয়াত-১)। উত্তরে হযরত মুহাম্মদ (স.) বললেন, আমি পড়তে জানি না।
জিবরাইল (আ.) তাঁকে জড়িয়ে ধরে বললেন,পড়ুন!তিনি বললেন আমি পড়তে জানি না। কিভাবে তিনবার প্রিয় নবী (স.) জড়িয়ে ধরলে। অতঃপর তৃতীয়বারের সময় তিনি পড়তে সক্ষম হলেন। বাড়ি ফিরে হযরত মুহাম্মদ (স.) হযরত খাদিজা (রা.) এর নিকট সব ঘটনা খুলে বললেন এবং জীবনে আশঙ্কা করলেন।তখন হযরত খাদিজা (রা.) তাঁকে সান্তনা দিয়ে বললেন- না,কখন না। আল্লাহর শপথ তিনি আপনাকে কখনো অপদস্ত করবেন না। কারণ আপনি আত্মীয়তা সম্পর্ক রক্ষা করেন, দুঃস্থ ও দুর্বলদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করেন, নিঃস্ব ও অভাবীদের উপার্জনক্ষম করেন।মেহমানদের সেবাযত্ন করেন এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে লোকেদের সাহায্য করেন। এতে বোঝা যায় যে, নবুয়ত প্রাপ্তির পূর্বে হযরত মুহাম্মদ (স.) কিরকম আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার সাথে মানবিক মহৎ গুণাবলী অনুশীলন করতেন এবং মানবতার সেবা নিয়োজিত থাকতেন। আমাদের উচিত বাস্তব জীবনে মহানবির এসব আদর্শ অনুশীলন করা…….।” ঠিক সেইসময় তাদের খেতে ডাকা হয়।“দাদুভাই আমাদেরকে মুহাম্মদ (স.) ও খাদিজা (রা.) এর বিবাহের ঘটনা বল না।” মালিহা বললো।“ কাল বলবো, দাদুভাই। এখন খেতে যাও। ঠিক আছে।” দাদা বলে।
(সমাপ্তি)