
লেখকনিতেঃ মোঃ রেজাউল ইসলাম
স্বপ্নের পথে এক অদম্য যাত্রা আমরা চাইলেই অনেক কিছু করতে পারি—এই বিশ্বাসটা যদি নিজের মধ্যে থাকে, তাহলে কোনো বাধাই আর বাধা থাকে না। ধৈর্য, পরিশ্রম আর নিজের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস থাকলে জীবনে অনেক দূর এগিয়ে যাওয়া সম্ভব। আমি এক মধ্যবিত্ত পরিবারের বড় ছেলে, কিন্তু আজ আমি যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, তাতে আমি আলহামদুলিল্লাহ খুশি।
আমরা সবাই জানি, ফেসবুকের প্রতিষ্ঠাতা হলেন, “মার্ক জুকারবার্গ” তবে ফেসবুক তৈরির পেছনের গল্পটা অনেকের কাছেই অজানা। ছোটবেলা থেকেই মার্ক প্রোগ্রামিংয়ের প্রতি আগ্রহী ছিলেন। মাত্র ১২ বছর বয়সে তিনি ‘জুকনেট’ নামের একটি মেসেজিং প্রোগ্রাম তৈরি করেন। তার বাবা-মা তার এই আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে একজন কম্পিউটার শিক্ষকও নিয়োগ দিয়েছিলেন, যা তার প্রতিভাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সবচেয়ে মজার বিষয় হলো, যখন মার্কের প্রেমিকা তাকে সব সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ব্লক করে দেয়, তখন জেদ করে তিনি এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেন, যা বিশ্বের সবচেয়ে বড় সোশ্যাল মিডিয়া হবে। আর সেই জেদ থেকেই জন্ম নেয় ফেসবুক। আজ তিনি বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ ধনীর একজন। যদি তার জায়গায় অন্য কেউ হতো, হয়তো হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিত। কিন্তু মার্ক তা করেননি।
আমরা সৃষ্টিকর্তাকে একবার জানাতে পারি যে সফল না হওয়া পর্যন্ত আমরা থামব না। হেরে গেলেও না, বারবার ব্যর্থ হলেও না। ছোটবেলায় যেমন হাঁটা শেখার সময় বারবার পড়ে গিয়েও আবার চেষ্টা করতাম, ব্যথা পেয়ে কেঁদে উঠেও দেয়াল ধরে আবার উঠে দাঁড়াতাম, এখন আবার সেই জেদ নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে লেগে থাকার সময় এসেছে। লোকে কী বললো বা কে কী করলো, তা নিয়ে না ভেবে শুধু নিজের কাজে মনোযোগ দিতে হবে। বাকিটা সৃষ্টিকর্তা আপনা-আপনিই ঠিক করে দেবেন।
নিজের স্বপ্নকে সত্যি করার পথে
মার্ক জুকারবার্গ হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় বর্ষে পড়ার সময় ফেসবুক তৈরি করেন। এরপর তিনি পড়াশোনা ছেড়ে দিয়ে ফেসবুকের পেছনে পূর্ণ সময় দেন এবং তার কোম্পানিকে ক্যালিফোর্নিয়ার পাওলো আলটোতে স্থানান্তর করেন। ২০০৪ সালের শেষে ফেসবুকের ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১০ লাখে পৌঁছায়। প্রথমে এর নাম ছিল ‘The Facebook’ পরে সংক্ষিপ্ত করে শুধু ‘Facebook’ রাখা হয়।
আমারও ইচ্ছা ছিল তাকে অনুসরণ ও অনুকরণ করার। তখন আমার বয়স ১৯। আমি তখন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স প্রথম বর্ষের ছাত্র। মনে মনে ভাবলাম, আমিও একটা ওয়েবসাইট তৈরি করব। কিন্তু আমার কাছে কোনো কম্পিউটার, ল্যাপটপ বা পিসি ছিল না। তখন ভাবলাম, আমার কাছে তো মোবাইল আছে! ইনশাআল্লাহ, আমিও মোবাইল দিয়েই ওয়েবসাইট তৈরি করতে পারব?
আমি গুগল আর ইউটিউবের সাহায্য নেওয়া শুরু করলাম। ওয়েবসাইট তৈরির জন্য ইমেইল দরকার, তাই একটি ইমেইল আইডি তৈরি করলাম। এরপর মনে হলো, ওয়েবসাইট তৈরির জন্য তো ডোমেইন ও হোস্টিং নেই। আবারও গুগলের কাছে সাহায্য চাইলাম এবং একটা সমাধান পেলাম।
ওয়েবসাইট তৈরি করতে কিছু নির্দিষ্ট বিষয় জানা ও শেখা জরুরি। নিচে ১০টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. প্ল্যাটফর্ম নির্বাচন: প্রথমে আপনাকে একটি প্ল্যাটফর্ম বেছে নিতে হবে, যেমন WordPress, Wix বা Google Sites।
২. ডোমেইন ও হোস্টিং: একটি ডোমেইন নাম এবং হোস্টিং পরিষেবা কেনা প্রয়োজন, যা আপনার সাইটকে অনলাইনে রাখতে সাহায্য করবে।
৩. ওয়েব ডিজাইন: সাইটের চেহারা এবং ব্যবহারকারী-বান্ধব লেআউট তৈরি করার জন্য ডিজাইন সম্পর্কে ধারণা থাকা জরুরি।
৪. কন্টেন্ট তৈরি: সাইটের জন্য আকর্ষণীয় এবং তথ্যপূর্ণ লেখা, ছবি ও ভিডিও তৈরি করতে জানতে হবে।
৫. কোডিং ভাষা: যদি আপনি আরও উন্নত সাইট তৈরি করতে চান, তাহলে HTML, CSS ও JavaScript শেখা আবশ্যক।
৬. এস ই ও (SEO): সার্চ ইঞ্জিনে সাইটকে সহজে খুঁজে পাওয়ার জন্য কিছু এস ই ও কৌশল (যেমন: কীওয়ার্ড রিসার্চ) জানা দরকার।
৭. নিরাপত্তা: ওয়েবসাইটকে হ্যাকিং থেকে রক্ষা করার জন্য নিরাপত্তার প্রাথমিক বিষয়গুলো শিখতে হবে।
৮. ওয়েবসাইট রক্ষণাবেক্ষণ: সাইটকে নিয়মিত আপডেট ও সুরক্ষিত রাখার জন্য রক্ষণাবেক্ষণের কৌশল জানা দরকার।
৯. গতি (Performance): সাইট দ্রুত লোড হওয়ার জন্য ছবি অপটিমাইজ করা এবং অন্যান্য কৌশল জানতে হবে।
১০. আইন ও গোপনীয়তা: অনলাইনে তথ্যের ব্যবহার এবং গোপনীয়তা সংক্রান্ত আইন সম্পর্কে ধারণা রাখা প্রয়োজন।
একাগ্রতা এবং সাফল্যের গল্পঃ
দুঃখের বিষয় হলো, আমার জীবনে এত বন্ধু থাকার পরও কেউ আমাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসেনি। কিন্তু আমি হাল ছাড়িনি। নিজের মেধা আর পরিশ্রম দিয়ে শেষ পর্যন্ত একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে ফেললাম। ১ জুন ২০২৩ সালে সেই ওয়েবসাইটটি প্রকাশিত হলো, যার নাম: https://selflessorg.wordpress.com/
এরপর, মাত্র ১ মাস ২০ দিনের মাথায় আমি সেই ওয়েবসাইটটিকে একটি অ্যাপে রূপান্তর করে ফেলি। সব কিছুই আমি শুধু একটি মোবাইল ফোন ব্যবহার করে করেছি।
অ্যাপটির লিংক: https://appsgeyser.io/17432023/Selfless-Organization
এই অভিজ্ঞতা থেকে আমি মনে করি, মানুষ যদি নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস রাখে, তাহলে তারা ফেসবুকের মতো বড় প্ল্যাটফর্মও তৈরি করতে পারে। আমার কাছে কোনো অর্থ ছিল না, তবুও আমি ওয়েবসাইট ও অ্যাপ তৈরি করতে পেরেছি। মনে রাখবেন, মানুষ আপনার সফলতার আগে সাহায্য করতে আসবে না। সফল হলে তবেই তারা আপনার পাশে দাঁড়াবে।
উপরের গল্প থেকে আমরা অনেক কিছু শিখতে পারি। প্রধান কিছু শিক্ষা নিচে দেওয়া হলো:
১. নিজের ওপর বিশ্বাস এবং জেদঃ
মার্ক জুকারবার্গের গল্প থেকে আমরা শিখি যে, জীবনে যদি কোনো বাধা আসে বা কেউ আপনাকে হতাশ করে, তাহলে জেদ করে তার চেয়েও বড় কিছু করে দেখানো সম্ভব। নিজের প্রতি বিশ্বাস এবং জেদ থাকলে বড় বড় সমস্যাও পার হওয়া যায়। গল্পের লেখকও কোনো কম্পিউটার বা ল্যাপটপ ছাড়াই শুধু মোবাইল দিয়ে ওয়েবসাইট ও অ্যাপ তৈরি করে এই বিশ্বাসেরই প্রমাণ দিয়েছেন।
২. পরিশ্রম আর ধৈর্যঃ
কোনো কিছু সহজে পাওয়া যায় না। ফেসবুক তৈরি করতে মার্ককে যেমন হার্ভার্ডের মতো বড় বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিতে হয়েছিল, তেমনি গল্পের লেখককেও অনেক পরিশ্রম করতে হয়েছে। তার কাছে কোনো কম্পিউটার ছিল না, বন্ধুরা সাহায্য করেনি, তবুও তিনি চেষ্টা করে গেছেন। এই ধৈর্য আর কঠোর পরিশ্রমই সফলতার মূল চাবি।
৩. সীমাবদ্ধতা নয়, সমাধান খোঁজাঃ
গল্পে দেখা যায়, লেখকের কাছে কম্পিউটার ছিল না। কিন্তু তিনি এই সীমাবদ্ধতাকে বাধা মনে না করে মোবাইলের মাধ্যমেই সমাধান খুঁজেছেন। আমাদেরও উচিত, কোনো কিছু নেই বলে থেমে না থেকে যা আছে তা দিয়েই কাজ শুরু করা।
৪. ব্যর্থতাকে মেনে না নেওয়াঃ
ছোটবেলায় আমরা হাঁটতে গিয়ে বারবার পড়েছি, কিন্তু হাল ছেড়ে দিইনি। এই গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ব্যর্থ হলে আবার চেষ্টা করতে হবে। বারবার ব্যর্থ হলেও লক্ষ্য থেকে সরে আসা যাবে না।
৫. মানুষের সাহায্য ছাড়াই এগিয়ে যাওয়াঃ
গল্পের লেখককে কেউ সাহায্য করেনি, তবুও তিনি সফল হয়েছেন। সফল হওয়ার আগে সাধারণত মানুষ পাশে থাকে না, কিন্তু সফলতার পর তারাই পাশে এসে দাঁড়ায়। তাই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভর না করে নিজের ক্ষমতায় কাজ করে যাওয়া উচিত।
গল্পের মূল বার্তা হলো, যদি আপনার লক্ষ্য থাকে এবং সেই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আপনি যথেষ্ট পরিশ্রম করতে রাজি থাকেন, তাহলে কোনো কিছুই আপনাকে থামাতে পারবে না।
জীবনের কোনো বাধাই যে অদম্য ইচ্ছাশক্তির কাছে বড় নয়, আমি তা মনে করি।