
কামারখাড়া হতে তিন মাইল পথ হাটলে নান্নয়ার বাজারের বুড়বুড়িয়া গ্রাম।আজকাল গ্রামের সবার মুখে এক গল্প শোনা যায়।রাজা গোবিন্দ মাণিক্য নয় এক সাধারণ পরিবারের একটি ছেলের গল্প।খালেক মিয়ার ছেলে বায়েজিদ গ্রামের একমাত্র ছেলে হিসেবে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পেয়েছে।বায়েজিদ গ্রামের সবার অনুপ্রেরণার প্রতীক।পড়াশোনার পাশপাশি পরিবারের জন্য টাকা পাঠানোতে চারদিকে খালেক মিয়া আর তার ছেলে বায়েজিদের প্রসংশায় মুখরিত সারা বুড়বুড়িয়া আর নান্নয়ার বাজার।
সেদিন নান্নুয়ার বাজারের বটতলার চায়ের দোকানে সানু মিয়া বলে
শোন,খালেক মিয়া তোমার ছেলে দেখবা একদিন অনেক বড় হইবো।
আমার পোলাডারে ত বোঝাই কোনো লাভ হয় না।এখন থেকে তোমার পোলা পরিবারে হাল ধরতাসে,দেইখো তোমাগো সুখের দিন আর বেশি দুরে নাই।
খালেক মিয়া,তা ত বটেই।ছেলেডা অনেক পরিশ্রম করে বুঝলা।দোয়া কইরো।
এ বলে খালেক মিয়া বাড়ির পথে রওনা দেয়।
ঢাকা শহর জাদুর শহর।রবিবারে মেসে বায়েজিদকে দেখে মনে হলো কোনো এক মুমূর্ষু রোগীর মতো।কোনো এক কারণে হতাশাগ্রুস্হ হয়ে মেসের বেডে শুয়ে আছে।নামাজের বেলা গড়িয়ে যাওয়ার খানিকক্ষণ পূর্বে নামাজের কথা মনে হলো।আজকের মোনাজাত অন্য দিনের তুলনায় ব্যতিক্রম লক্ষণীয়।মোনাজাতে হয়তো বিশেষ কিছুর আবেদন সৃ্ষ্টিকর্তার নিকট।
পরের দিন সকালে শহুরে রাস্তায় বায়েজিদ মনে মনে কল্পনা করছে
-যদি আজকে টিউশনিতে ছাত্র আমাকে কোনো কঠিন কিছু জিগেস করে আটকিয়ে দেয় তখন কি করবো?যদি আমি কিছু ভুল করে বসি ছাত্রের সামনে বা ছাত্র যদি বলে স্যার আপনি পারে না।
আচ্ছা যদি অভিভাবক জিগেস করে কোন ডিপার্টমেন্টে পড়ো?
আমি যদি বলি ,,,,,,পড়ি।তারপরের দিন যদি টিউশন টা চলে যায়।
কিছু দিন আগে একটা টিউশন বায়েজিদের হাতছাড়া হয়ে গিয়েছিল।কারণ শিক্ষার্থী গনিত,পদার্থ,রসায়ন পড়বে।আর বায়েজিদ বাংলা বিভাগ পড়ে বলে অভিভাবক পরের দিন থেকে আসতে নিষেধ করেছে।
এলাকার আঞ্চলিক সংগঠন আর সিনিয়রদের পরামর্শে কিছু টিউশন পেয়েছে।টিউশন থেকে প্রাপ্ত অর্থ নিজে চলার মতো কিছু রেখে বাকিটা পরিবারের জন্য পাঠিয়ে দেয়।
স্কুল,কলেজে বিজ্ঞান বিভাগে পড়লে ও ভাগ্যের লেখনিতে এখন বাংলা বিভাগে অধ্যয়রণরত।
শহরের রাস্তায় বাসের হর্ণে মূহুর্তে কল্পনা জগৎ থেকে বাস্তব জগতে পদার্পণ করে বায়েজিদ।পাচ তলা দালানের সামনে এসে দাড়াতেই অভিভাবক এসে উপস্থিত হয়।টিউশন শেষে মেসের উদ্দেশ্যে রওনা দেয় সে।হটাৎ কিছু একটা জিনিস পায়ে গেথে রক্ত বের হয়ে গেছে।
মনের আর্তনাদ আত্ম সম্মান আর একটা যত্ন না নেওয়া খাচায় আটকে থাকে।কি জিনিস?হাতে তুলতে দেখে একটা ইটের কণা।
দোষ কি ইটের কণার?
আসলে বায়েজিদের জুতা জোড়া শেষ চিহ্ন টুকু নিয়ে কোনো রকম বেচে আছে।জুতা কোনো রকম পায়ে দিয়ে টিউশন করাতে যায়।
মেসে আসার পরে পায়ের রক্ত মুছতে গেলে ফোনে কল বেজে উঠল
বাবা,কেমন আসত?
হ্যা মা ভালো।
তুমি কেমন আছ
ভালো বাজান।
বাবা,শোন না,, গতকাল পাশের বাড়ির রানু,,,
মা চিন্তা করই না আমি এ মাসে পাঠিয়ে দেমু রানুর টাকা।
কল কেটে রক্ত মোছা শেষ হলে সে ক্লাসের প্রেজেন্টেশন রেডি করে।
সবাই প্রেজেন্টেশনে বই নিয়ে এলেও বায়েজিদের হাতে বই ছিল না।
শিক্ষকের কাছে কিছুটা বকা শোনে প্রেজেন্টেশন শেষ হয়।ক্যাফেটেরিয়াতে খাওয়ার সময় নেয়ামত এসে বলে
কিরে সবসময় তুই কেন ভাত আর ভাজি খাস?ভেজেটেরিয়ান নাকি?কোনো দিন ত তকে মুরগি নিতে দেখলাম না।
হুম,সবজি আর ডাল খুব ভালো লাগে রে।
ভার্সিটি শেষে মেসে এসে দেখে এ মাসে চলার মতো ৫০০ টাকা আছে।
বাড়িতে কিভাবে টাকা দেবো?পরের মাসে ত আর বাড়িতে টাকা দিতে পারবো না।মাকে ত বলে দিয়েছি টাকা দেবো।এদিকে একটা টিউশন হাতছাড়া হয়ে গেল,,,
যদি এক-দুইটা টিউশন মেনেজ করতে পারি হয়তো সব ঠিক থাক হয়ে যাবে।রাতে টিউশন মিডিয়ার পেইজগুলোতে অনেক মেসেস দিল বায়েজিদ।রাতের আকাশের দিকে তাকিয়ে কল্পনায় বিভোর।শহরের উচু দালান সব ভেঙ্গে গিয়ে মাটিতে মিশে যাচ্ছে।একটু পরে একটা নোটিফিকেশনে ফেসবুকে প্রবেশ।
লেখা,কোচিং সেন্টারে গনিত বিষয়ের জন্য গনিত শিক্ষক লাগবে।আপনি ত বাংলা বিভাগে পড়েন আপনাকে ত নিবে না।
বায়েজিদ লেখে,বাংলা বিভাগে পড়লে কি কেউ নবম-দশম শ্রেণির গনিত পাড়বে না?কাউকে ডিপার্টমেন্ট দিয়ে মূল্যায়ণ করা উচিত নয়।রাগে মোবাইল রেখে ঘুমাতে যায়।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার শুরুর দিকে একটা পেইজ থেকে টিউশন দেওয়ার নাম করে বায়েজিদ থেকে ৫০০ টাকা নিয়ে গেছে।কোনো টিউশন দেয় নি।তার পরে সে অনেক পেইজে আবার চেষ্টা করেছে।কোনো ভালো লোক ত থাকবে।
সকালে দরজায় ঢক ঢক আওয়াজ।কেউ হয়তো বাহিরে দাড়িয়ে আছে।এক বন্ধু এসে বললো, বন্ধু একটা টিউশন আছে।কাল থেকে শুরু করিস।
ফেসবুক থেকে নোটিফিকেশন আসে,বায়েজিদ এই টিউশনটি আপনাকে দেওয়া হয়েছে।উচ্ছ্বাসে বায়েজিদ উঠে দেখে চারদিকে অন্ধকার ছাড়া আর কিছুই নেই।আসলে বায়েজিদ স্বপ্ন দেখেছিল।তারপরে আবার ঘুম।
দরজায় ঢক ঢক আওয়াজ।এবার স্বপ্ন নয়।সত্যিই ঢক ঢক আওয়াজ।
তবে বায়েজিদের সারা পাওয়া গেল না।
লেখক পরিচিতি:
মো.রিমেল
বাংলা বিভাগ,কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়