
সময়টা আনুমানিক রাত এগারোটার কাছাকাছি।
ক্লাসরুমটা ছাত্রদের কোলাহলে মুখরিত—কারণ মাত্রই ঘুমের ছুটি হয়েছে।
গত কয়েকদিন ধরে আহমাদ আইমানের সাথে কথা বলছে না! তাই ইচ্ছে না থাকলেও আইমান এবার তার কাছে গিয়ে বসে। তারপর সাহস করে জিজ্ঞেস করে,
— “আমার সাথে কথা বলছো না কেন?”
কিন্তু আহমাদ কোনো কারণ জানায় না। এতে আইমানের হতাশা আরও ঘনীভূত হয়। অনেক অনুরোধের পরে একসময় আহমাদ শুধু বলে,
— “নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করো।”
এই অনাকাঙ্ক্ষিত বাক্য আইমানকে মুহূর্তেই ভেঙে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দেয়। তার মনে হয়, যেন হঠাৎ চারপাশটা অন্ধকার হয়ে গেল। কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর আহমাদ আবারও বলে,
— “দূরে সরে দাঁড়াও।”
তখন অভিমানী আইমান চুপচাপ সরে আসে।
সবাইকে খুব হাসিখুশি দেখা যাচ্ছে আজ। কিন্তু আইমানের মুখে নেই কোনো হাসি। হতাশা যেন তার হৃদয়ে ধীরে ধীরে বাসা বেঁধে ফেলেছে।
রুমের একটি কোণে সে নিরব, স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কেউ সিট করছে, কেউ অজু-ইস্তেঞ্জা সেরে ঘুমের প্রস্তুতি নিচ্ছে—সবাই ব্যস্ত নিজের মতো।
কিন্তু আইমান এখনো একই জায়গায়।
মাত্র দশ মিনিট আগেও সবকিছু ঠিক ছিল। দশ মিনিটের ব্যবধানে তার কাছে পুরো আলোকময় পৃথিবীটা হঠাৎই অন্ধকার হয়ে গেছে যেন। আকাশটা যেন মাথার উপর ভেঙে পড়েছে।
অন্যদিকে আহমাদ রুমের আরেক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে, আইমানের প্রতি তার আচরণের জন্য অনুতপ্ত।
আইমান অপলক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে—চিন্তা, স্মৃতি আর কল্পনার জগতে হারিয়ে।
ও হ্যাঁ—আইমান আর আহমাদের পরিচয় তো বলা হলো না!
ওরা দুই বন্ধু। কয়েক মাস আগে তাদের পরিচয় হলেও অল্প সময়েই পরস্পরে খুব কাছের বন্ধু হয়ে ওঠে।
বয়সেও সমবয়সী, আরো অনেক দিক দিয়েই মিল রয়েছে। দুজনেরই এটাই প্রথম গভীর বন্ধুত্ব, তাই একে অপরের প্রতি তাদের যত্নও অনেক বেশি।
আহমাদের মন খারাপ হলেই আইমান ছুটে যায়, জিজ্ঞেস করে—“কী হয়েছে?”
আইমানের ক্ষেত্রে আহমাদের আচরণও একইরকম।
বন্ধুত্বের প্রথম দিকের স্মৃতিগুলো আইমানের মাথায় ভেসে উঠছে।
সবাই শুয়ে পড়েছে, কিন্তু কেন যেন সে নিজের ঘুমানোর কথাটাই ভুলে গেছে।
তার হতাশা আর কষ্ট দেখে আহমাদও আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না।
বন্ধুর কষ্টে কষ্ট পাওয়া—এটাই তো প্রকৃত বন্ধুত্ব!
আহমাদ ধীরে ধীরে এসে আইমানের হাত ধরে বলে,
— “চলো, ঘুমিয়ে পড়ো। আমরা দুই বন্ধু একসাথে চললে অনেকে নানা মন্তব্য করে, যা আমাদের জন্য ভালো নয়।”
তখন আইমানের ছোট্ট হৃদয় বুঝতে পারে—সম্পর্ক ভাঙার পেছনে মাঝে মাঝে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ।