
একটি পরিবারের চালিকাশক্তি যদি হয় পিতা, তবে সেই শক্তির সুযোগ্য উত্তরাধিকারী এবং ভবিষ্যতের ধারক হলো জ্যেষ্ঠ সন্তান বা বড় ছেলে। বাংলায় একটি কথা প্রচলিত আছে, “বড় ছেলে হলো পরিবারের খুঁটি।” এই কথাটি কোনো অতিরঞ্জন নয়, বরং এক কঠোর বাস্তব। শৈশব পেরিয়ে কৈশোরে পা দিতে না দিতেই যে ছেলেটির চোখে রঙিন স্বপ্ন ডানা মেলার কথা, সেই ছেলেটিই পরিস্থিতির চাপে হয়ে ওঠে পরিবারের ‘নবীন বটবৃক্ষ’। নিজের সুখ-বিলাসিতাকে বিসর্জন দিয়ে অন্যের মুখে হাসি ফোটানোই যার জীবনের পরম ব্রত হয়ে দাঁড়ায়।
প্রথাগত সমাজ ব্যবস্থায় পিতার অবর্তমানে বা পিতার বার্ধক্যে পরিবারের হাল ধরার প্রথম দায়িত্বটি আসে বড় ছেলের ওপর। কিন্তু বর্তমান সময়ে দেখা যায়, পিতা জীবিত থাকাকালীনও বড় ছেলেটি নিজের অজান্তেই কাঁধে তুলে নেয় সংসারের অর্ধেক বোঝা। সে কেবল একটি সন্তান নয়, বরং ছোট ভাই-বোনদের কাছে এক আদর্শ শিক্ষক, মায়ের কাছে আস্থার প্রতীক এবং বাবার কাছে একটি শক্তিশালী স্তম্ভ। বড় ছেলের কাছে নিজের ক্যারিয়ারের চেয়েও বড় হয়ে দাঁড়ায় ছোট বোনের বিয়ে বা ছোট ভাইয়ের পড়াশোনার খরচ।
একজন বড় ছেলের ডায়েরির পাতাগুলো পড়লে দেখা যাবে সেখানে ব্যক্তিগত চাহিদার চেয়ে পরিবারের চাহিদার তালিকা অনেক দীর্ঘ।
• শখের বিসর্জন: নিজের সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে হয়তো একটি দামী স্মার্টফোন বা পছন্দের ব্র্যান্ডের পোশাকটি কেনে না। কারণ তার মাথায় তখন ঘুরপাক খায় সামনের মাসে বাড়িতে পাঠাতে হবে এমন টাকার অংকটা।
• স্বপ্ন সংকুচিত করা: অনেক মেধাবী বড় ছেলে উচ্চশিক্ষা বা গবেষণার সুযোগ পেয়েও তা ছেড়ে দেয় কেবল দ্রুত উপার্জনের আশায়, যাতে পরিবারকে আর্থিক স্বচ্ছলতা দিতে পারে।
• একাকীত্ব: বড় ছেলেরা সচরাচর তাদের কষ্টের কথা কাউকে বলতে পারে না। তাদের চোখের জল আড়াল করার এক অদ্ভুত ক্ষমতা থাকে। ছোট ভাই-বোনদের সামনে সে সবসময় হাস্যোজ্জ্বল, কিন্তু বালিশ জানে তার রাতের দীর্ঘশ্বাসের ওজন কতটুকু।
বর্তমান যুগে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং প্রতিযোগিতামূলক কর্মসংস্থানের বাজারে একজন বড় ছেলের লড়াই আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। এখনকার সময়ে বড় ছেলেকে কেবল ঘরের খরচ চালালেই হয় না, তাকে সামাজিক মর্যাদা বজায় রাখা এবং ভবিষ্যতের নিরাপত্তার কথাও ভাবতে হয়।
আজকাল অনেক বড় ছেলে প্রবাসে থাকে। বিদেশের মাটিতে অমানবিক পরিশ্রম করে সে যখন বাড়িতে টাকা পাঠায়, তখন তার নিজের শরীর বা মনের স্বাস্থ্যের দিকে তাকানোর সময় থাকে না। ঈদে সবার জন্য নতুন কাপড় পাঠালেও নিজের জন্য হয়তো গত বছরের পুরনো পাঞ্জাবিটাই রয়ে যায়। এই যে “Selfless” বা নিঃস্বার্থ মানসিকতা, তা বর্তমান স্বার্থপর পৃথিবীতে বিরল।
বড় ছেলের জীবনযুদ্ধের একটি বড় চ্যালেঞ্জ শুরু হয় বিয়ের পর। তাকে একদিকে মা-বাবার অধিকার রক্ষা করতে হয়, অন্যদিকে স্ত্রীর অধিকার ও সম্মান নিশ্চিত করতে হয়। সে হয়ে ওঠে এক দক্ষ নাবিক, যে উত্তাল সমুদ্রের মাঝেও ভারসাম্য বজায় রাখে। নিজের স্ত্রী-সন্তানকে সময় দেওয়ার চেয়েও সে বেশি গুরুত্ব দেয় তার ওপর নির্ভরশীল ভাই-বোনদের স্বাচ্ছন্দ্যকে। এই ত্যাগের মহিমা অনেক সময় বাড়ির অন্য সদস্যরা বুঝতে পারে না, কিন্তু সে অভিযোগহীনভাবে নিজের দায়িত্ব পালন করে যায়।
যে ঘরে একটি আদর্শ বড় ছেলে থাকে, সেই ঘরটি একটি মজবুত দুর্গের মতো। সে কেবল টাকা আয় করে না, সে পরিবারের মূল্যবোধ ধরে রাখে। ছোট ভাই-বোনেরা তাকে দেখে শিখতে পারে কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে হয়। সে হলো সেই মানুষ, যে নিজের কাঁধ শক্ত করে রাখে যাতে অন্যেরা তাতে মাথা রেখে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারে।
বড় ছেলে হওয়া মানে কেবল বয়সে বড় হওয়া নয়, বড় ছেলে হওয়া মানে বিশাল হৃদয়ের অধিকারী হওয়া। তার কাছে সুখ মানে হলো মাসের শেষে বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে মায়ের তৃপ্তির হাসি দেখা, বাবার নিশ্চিন্ত মুখটা দেখা আর ছোট ভাই-বোনের সাফল্যে আনন্দ পাওয়া।
একটি পরিবারে জ্যেষ্ঠ সন্তানের অবদান কখনও তুলাদণ্ড দিয়ে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। সে হলো সেই প্রদীপ, যা নিজে পুড়ে অন্যকে আলো দেয়। প্রতিটি ঘরে এমন একজন দায়িত্বশীল সন্তান জন্ম নেয় না। কিন্তু যে পরিবারে এমন একজন “বড় ছেলে” আছে, সেই পরিবার নিঃসন্দেহে পৃথিবীর অন্যতম ভাগ্যবান পরিবার।