
সাবিত রিজওয়ান
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দল ও আদর্শের বিচ্ছেদ নতুন নয়। এই বাস্তবতা বোঝার জন্য প্রথমেই ফিরে যেতে হয় মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর প্রসঙ্গে। আওয়ামী মুসলিম লীগের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি হিসেবে ভাসানী রাজনীতিকে দেখতেন জনমানুষের অধিকার, সাম্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে। তাঁর রাজনীতি ছিল আদর্শনির্ভর, ক্ষমতানির্ভর নয়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দল যখন ক্ষমতাকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে, তখন ভাসানী সেই রাজনৈতিক পথ পরিত্যাগ করেন। এটি ছিল আদর্শ বনাম ক্ষমতার প্রথম বড় দ্বন্দ্ব।
ভাসানীর প্রস্থানের পর শেখ মুজিবুর রহমান দলীয় নেতৃত্বে প্রভাবশালী হন। স্বাধীনতার পর রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে পেয়ে তিনি একদলীয় শাসনের পথে অগ্রসর হন। এখানেই ইতিহাসের একটি স্পষ্ট যুক্তি দাঁড়ায়—যে রাজনীতি আদর্শ দিয়ে শুরু হয়েছিল, ক্ষমতার চাপে এসে তা স্বৈরতন্ত্রের দিকে মোড় নেয়। এটি ব্যক্তির নয়, ক্ষমতার চরিত্রের সমস্যা।
এই ধারাবাহিকতা আমরা শেখ হাসিনার শাসনামলেও দেখেছি। তিনি গণতন্ত্রের কথা বললেও বাস্তবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেছেন, বিরোধী মত দমনের অভিযোগ উঠেছে বারবার। ফলে প্রশ্ন ওঠে—মাওলানা ভাসানীর আদর্শ আওয়ামী লীগ কতটুকু বহন করেছে? ইতিহাসের উত্তর খুব স্পষ্ট: খুব কম।
এই প্রেক্ষাপটে আজ বিএনপির দিকে তাকালে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। শহীদ জিয়াউর রহমান বহু বছর আগে শাহাদাত বরণ করেছেন, এবং আজ সংবাদে জানা গেল বেগম খালেদা জিয়া আর নেই। অর্থাৎ বিএনপিও এখন সেই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে একসময় আওয়ামী লীগ দাঁড়িয়েছিল—নেতৃত্ব-পরবর্তী রাজনীতি।
এখন প্রশ্ন ব্যক্তিনির্ভর নয়, প্রশ্ন আদর্শের। শহীদ জিয়ার বহুদলীয় গণতন্ত্রের দর্শন এবং বেগম খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক সংগ্রামের মূল্যবোধ বর্তমান বিএনপি কতটুকু ধারণ করবে? যদি দলটি কেবল ক্ষমতার রাজনীতিতে আটকে যায়, তবে ইতিহাসের একই চক্রে ঘুরে দাঁড়াবে—যেভাবে আওয়ামী লীগ ভাসানী-পরবর্তী সময়ে দাঁড়িয়েছিল।
ইতিহাস আমাদের একটাই যুক্তিসঙ্গত শিক্ষা দেয়:
নেতা চলে গেলে দল টিকে থাকে আদর্শে, ক্ষমতায় নয়।
বিএনপি যদি এই সত্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়, তবে দলটিও ধীরে ধীরে আরেকটি “অন্য জাতির” দলে পরিণত হবে—নাম থাকবে, আদর্শ থাকবে না।