1. admin@ichchashakti.com : admin :
সোমবার, ০৬ জুলাই ২০২৬, ১১:৫৯ অপরাহ্ন

আঁধারে আলোর দিশা

  • প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২১ নভেম্বর, ২০২৫
  • ২০৩ বার প্রতিবেদনটি দেখা হয়েছে

মোঃ আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু 

 

অন্ধকার গলির এই ঘরটাতে শফিকের আজই প্রথম আসা নয়। শরীর নামক দানবের জৈবিক ক্ষুধা মিটাতেই প্রায়শই সে এখানে আসে। কথামতো তৈরি থাকে তার পছন্দ মতো মেয়ে। যথারীতি তার ক্ষুধা মিটিয়ে চলে যায় আপন ঠিকানায়।

 

কিন্তু আজকের দৃশ্যটা একটু ভিন্ন মনে হলো তার কাছে। ভেতরে ঢুকতেই দেখে, এক মেয়ে জানালার পাশে বসে নীরবে কাঁদছে। জানালা দিয়ে কালো মেঘে ঢাকা আকাশের খানিকটা চোখে পড়ছে। সেদিকে এক নজর দেখার পর দৃষ্টি ফিরিয়ে আবার মেয়েটার দিকে তাকিয়ে দেখল সেই আগের মতোই তার চোখ দিয়ে শ্রাবণের অবিরাম বারিধারা ঝরে চলেছে।

 

— “কাঁদছো কেন?” জিজ্ঞেস করলো শফিক।

মেয়েটা মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে বলল,

— “ না এমনি। কিছু না… আপনি বসুন, আমি প্রস্তুত হচ্ছি।”

 

ওর কণ্ঠে এমন ভাঙা সুর ছিল যে, শফিকের মনটা অদ্ভুতভাবে মোচড় দিয়ে উঠল। ক্ষুধার্ত বাঘ্রের মন হঠাৎ করেই কি মায়াবী যাদুতে যেন নরম হয়ে গেল।

সে আবার জিজ্ঞেস করল,

 

— “আমাকে কি বলতে পারো, কি হয়েছে তোমার?”

প্রশ্ন শুনে সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। অতঃপর সে মুখে কান্না চাপা হাসি টেনে বলল,

 

— “আপনি জেনে কি করবেন? এসব বিষয় জানা না থাকাই ভালো।”

 

— “তবুও জানতে চাই, বলো না।” দৃঢ় কণ্ঠে বলল শফিক।

 

একটু চুপ থেকে মেয়েটা বলল,

— “বাড়ির কথা মনে পড়ছে, বৃদ্ধ অসুস্থ বাবা ও ছোট দুটি ভাই বোনকে দেখতে ইচ্ছা করছে খুব। ওদের কথা ভেবে দম বন্ধ হয়ে আসছে। কেমন যেন নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে।”

 

আমি অবাক হয়ে বললাম,

— “তাহলে এখানে আছো কেন? চলে যাও না বাড়িতে ওদের কাছে! ”

 

সে অতি কষ্টে শুকনো একটা হাসি হেসে বলল,

— “চাইলেই কি সবকিছু করা যায়? খাঁচা বন্দি পাখি চাইলেই কি উড়তে পারে মুক্ত আকাশে?

 

শফিক হতভম্ব হয়ে জিজ্ঞেস করলো,

— “মানে?”

 

— “ মানে আবার কি? আমার ভালোবাসার মানুষ যাকে আমি আমার সবকিছু সঁপে দিয়েছিলাম সেই আমার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে আমাকে এখানে বিক্রি করে গেছে সামান্য কিছু টাকার বিনিময়ে। যেকথা আমি পরে জেনেছি এখান থেকে।  এখন এ জায়গাটাই আমার বন্দী খাঁচার মতো কারাগার। এ কারাগার থেকে মুক্তির আশা দুরাশার মতো। ”

 

কথাগুলো শুনে শফিকের বুকটা কেঁপে উঠল। শফিক জিজ্ঞেস করলো

— “সত্যিই কি তাই?”

 

— “হ্যাঁ, সত্যি। প্রায় পাঁচ মাস আগে ওকে ভালোবেসে বাড়ি থেকে পালিয়ে দু চোখে রঙিন স্বপ্ন এঁকে নতুন ঘর বাঁধার প্রত্যয়ে অজানার উদ্দেশ্য পাড়ি দিয়েছিলাম অচেনা গন্তব্যে। রাজধানী শহর ঢাকায় দুইদিন একসাথে থাকার পরই ও আমাকে বিক্রি করে দেয়। তারপর থেকেই ওর পাশবিক রূপ আমাকে দুঃস্বপ্নের মতো তাড়িয়ে বেড়ায়। ”

 

তারপর নীরবতা। নিঃশব্দে কেটে যায় কিছুক্ষণ।

এবার আর চুপ থাকতে পারলো না শফিক নীরবতা ভেঙে সে বলল,

— “তুমি চাইলে আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে পারি। তোমাকে নতুন জীবনের স্বপ্ন দেখাতে পারি।”

 

সে অবাক হয়ে তাকাল,

— “আপনি জানেন, আমি কে?”

 

— “জানি, কিন্তু তাতে কী আসে যায়? আমি তোমাকে নিয়ে বাঁচতে চাই। ঘর বাঁধতে চাই তোমাকে নিয়ে। আমি তোমাকে  বিয়ে করতে চাই।”

 

সে বিস্মিত হাসি হেসে বলল,

— “আপনার মাথা ঠিক আছে তো? জানেন আপনি কি বলছেন? জানেন আমি কে? কি আমার পরিচয়?

এরকম একগাদা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়ে সে বলল, “আমি তো এক পতিতা। সমাজে এছাড়া আর কোনো পরিচয় নেই আজ আমার।”

 

— “তোমার অতীত আমি মুছে ফেলতে পারবো না, কিন্তু তোমার আগামী আমি লিখতে চাই।” বলল শফিক।

 

মেয়েটি ফ্যাল ফ্যাল করে শফিকের মুখের দিকে তাকিয়ে নীরব হয়ে রইলো। কিছুক্ষণ পর সে বলল,

— “আপনি কেন এমন করছেন? আপনি কি বলছেন, বুঝতে পারছেন? আপনি যা কিছু বলছেন সব ভেবে বলছেন তো? ”

 

শফিক সম্মতি সূচক মাথা নাড়ালো আর বলল,

“আমি যা কিছু বলছি সব ভেবে চিন্তেই বলছি। কারণ তোমার চোখে আমি ভরসা খুঁজে পেয়েছি। সেই ভরসার আলোতেই আমরা আমাদের আগামীর পথ আলোকিত করতে পারবো বলে আশা রাখি।”

 

— “কিন্তু আপনি আমাকে চিনেন না, জানেন না এটা কি করে সম্ভব?”

 

— “ নিশ্চয়ই চিনবো, সময় নিয়ে জানবো গভীরভাবে। তবে বিয়ের পরই শুরু হবে সেই চেনা জানা। এখন যতটুকু চিনেছি তাতেই চলবে।”

 

— “আপনার পরিবার কি মানবে?”

 

— “আমার তো পরিবারই নেই, আমি একাই।” “আমাকে ফিরিয়ে দিয়ো না” বলে মেয়েটির হাতে হাত রাখল শফিক। মেয়েটি আর কোনো কথা বলতে পারল না। শুধু তার চোখ দুটি সিক্ত হয়ে উঠলো।

— ধরা গলায় মেয়েটি বলল “তাহলে কিভাবে আমাকে এখান থেকে বের করবেন?”

 

— “সেটা আমি দেখব। ও বিষয়টা আমার উপরই ছেড়ে দাও। শুধু বলো, আমার সাথে নতুন জীবন শুরুতে তোমার কোনো আপত্তি নেই।”, বলল শফিক।

 

দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিয়ে মেয়েটা বলল,

— “ঘরপোড়া গরু সিঁদুরে মেঘ দেখলে ডরায়। বিশ্বাস করতে ভয় লাগে… তবুও মনে হয় আপনার কথা সত্য। আপনাকে বিশ্বাস করা যায়।”

 

—শফিক যাবার সময় বলে গেল, “তাহলে কথা রইলো তুমি তৈরি থাকবে। আমি আগামীকাল ঠিক এই সময় এসে তোমাকে নিয়ে যাবো এখান থেকে আমাদের নতুন ঠিকানায়।”

 

উত্তেজনায় সারারাত ঘুম হলো না মেয়েটির। ওদিকে শফিক যথাস্থানে প্রয়োজনীয় অর্থের বিনিময়ে মেয়েটিকে এ অভিশপ্ত বন্দীদশা চিরমুক্তির সব ব্যবস্থা করে ফেলল। পরদিন কথা অনুযায়ী সময় মতো মেয়েটিকে মুক্ত করে নিয়ে সোজা কাজী অফিসে। সেখানে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শেষে শফিক হাতে হাত রেখে  বলল,  আশা (শফিকের দেওয়া মেয়েটির নতুন নাম) এবার চলো আমরা আমাদের হৃদয়ে নতুন স্বপ্ন আঁকি। লজ্জারাঙা আনত মুখে আশাও বলল,

–“চলুন।”

শফিক তার ডান হাত দিয়ে আশার মুখ আটকে বলল, “উঁ হু,  এখন থেকে আর চলুন না।” বলো, “চলো।”

একথা শুনে আশা মৃদু হেসে সম্মতিসূচক মাথা নেড়ে শফিকের হাত ধরে সামনে অগ্রসর হতে লাগল….. রঙিন স্বপ্নগুলো মুক্ত বিহঙ্গের মতো  ডানা মেলে তাদের কল্পনার আকাশে উড়তে লাগলো……।

Facebook Comments Box
এই ক্যাটাগরির আরও খবর
© স্বত্ব সংরক্ষিত © ২০২৪ ইচ্ছাশক্তি
Theme Customized By Shakil IT Park