
মোঃ আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু
চিরচেনা স্টেশনটি রোমানের কাছে আজ বড্ড অচেনা লাগে। সে চুপচাপ একটি বেঞ্চে বসেছিল। তার পরনে হালকা গোলাপি রঙের পাঞ্জাবি ও সাদা পায়জামা। রোহিনীর বড় পছন্দের ছিল ড্রেসটি। উপহার হিসেবে পাওয়া ড্রেসটি রোহিনীর নিজের পছন্দেই কেনা। রোহিনী নামটি এখনো রোমানের হৃদয়ে ঝংকৃত হয় নুপুরের নিক্কনের মতো।
অপেক্ষার স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম নম্বর দুই। দিনের আলো বেশ আগে নিভে গেলেও ঘড়িতে তখনো একটা ধূসর আলো লেগে আছে। এই স্টেশনে সময় যেন চলে অলসতায়, পা মেপে মেপে বড্ড ধীরে ধীরে । পুরোনো দেওয়ালগুলোতে শেওলা আর স্মৃতির চুনকামের সাথে লাল রঙ। আর বাতাসে মিশে আছে অজানা ব্যথার দীর্ঘশ্বাস। এটি শুধু একটি স্টেশন নয়, এ যেন এক অপেক্ষমান প্ল্যাটফর্ম—যে তার নিজের কাঙ্ক্ষিত ট্রেনটিকে এখনো খুঁজে পায়নি।
রোহিনী নামটা আজও রোমানের কাছে একটা হুইসেলের শব্দের মতো—যা দূর থেকে শোনা যায়, কিন্তু কখনই কাছে এসে ধরা যায় না। বিদায়ের বিউগল সুর হয়ে বাজে কানে!
রোমান কোনো নির্দিষ্ট ট্রেনের জন্য অপেক্ষা করছে না। তার গন্তব্যের ও কোনো ঠিক ঠিকানা নেই। সে গত দশ বছর ধরে সপ্তাহের প্রতি শনিবারে কোনো এক অজানা টানে এই প্ল্যাটফর্মে আসে। সন্ধ্যা নামার পর, যখন যাত্রীদের ভিড় পাতলা হয়ে আসে, তখন সে ঠিক এই বেঞ্চটিতে বসে। ভাবনার অতলে ডুবে যায়, কথা বলে আপন মনে।
সে অপেক্ষা করে রোহিনীর জন্য। সময় চলে যায় সময়ের পথে। তার অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হয় না…
তারা এখান থেকেই প্রথমবার এক গোপন সফরে বেরিয়েছিল। ফিরতি পথে রোহি,বলেছিল, “এই স্টেশন বড়ো মায়া জড়ানো আমাদের কাছে। যেখানে শেষ হয় না কোনো গন্তব্য, শুরু হয় অনন্ত অপেক্ষা।”।
সেদিনের সেই ভয়ানক দুর্ঘটনার কথা মনে হলে আজও রোমানের গা শিউরে ওঠে। ভুল সিগনালের কারণে সেদিন তাদের ট্রেনটি একই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকা একটি মালবাহী ট্রেনকে সজোরে ধাক্কা দেয়। সেই দুর্ঘটনায় প্রচণ্ড ঝাঁকুনিতে যাত্রীাহী ট্রেনের কয়েকটি বগি লাইন চ্যুত হয়ে গিয়েছিল। রোমান আহত হয়ে বেঁচে গেলেও রোহিনীর জীবন থেমে গিয়েছিল চিরতরে।রোহিনীর স্মৃতিগুলো রোমানকে নিঃশব্দে কাঁদায়। বার বার টেনে নিয়ে আসে স্টেশনে। অপেক্ষা চলতেই থাকল।
আজ রোমান বুঝেছে, সে আসলে রেহিনীর জন্য অপেক্ষা করে না। সে অপেক্ষা করে সেই “অপেক্ষা” নামক অনুভূতির জন্য। রোহিনীর চলে যাওয়ার পর জীবনের গতিপথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। কাজ, খাওয়া, ঘুম—সবই চলে যন্ত্রের মতো গঁত বাঁধা নিয়মে, কেবল মনটা পড়ে থাকে এই প্ল্যাটফর্মে। এখানে সে আসে অপেক্ষা করে রোহিনীর আসার। তার মনে প্রশ্ন জাগে, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে সে। আচ্ছা রোহিনী কি সত্যিই মারা গেছে? মানুষ মরে গেলে নাকি আকাশের তারা হয়ে ফুটে থাকে! আকাশে তো অনেক তারা, তাহলে রোহিনী কোনটা? সত্যিই কি রোহিনী তারা হয়ে তাকে দেখছে? মনে এসব ভাবনা এলে, প্রশ্ন এলে সে খুব বিচলিত হয়ে পড়ে। তারও ইচ্ছা করে তারা হয়ে রোহিনীর পাশে পাশে থাকতে। একমাত্র এই অপেক্ষার মুহূর্তেই সে নিজেকে অনেকটা স্থির মনে করে, জীবিত মনে করে। কারণ অপেক্ষা মানেই এখনো কিছু বাকি আছে, এখনো একটা সম্ভাবনা ঝুলে আছে দিগন্তে।
ঠিক রাত নয়টা পনেরো মিনিটে ডাউন লাইনে ইন্টারসিটি ‘একতা এক্সপ্রেস ’ ঢোকে। ট্রেনের ঝিকঝিক শব্দে প্ল্যাটফর্ম কেঁপে ওঠে। যাত্রীরা দ্রুত নামে, দ্রুত ওঠে। রোমান দেখতে পায়, এক বৃদ্ধা তার নাতনির হাত ধরে নেমে এলেন। নাতনির চোখে নতুন গন্তব্যের উত্তেজনা। একদল তরুণী হাসতে হাসতে কামরা থেকে নামল। এক জুটি ট্রেন থেকে নেমে পরস্পর হাত ধরে পথ চলছে। তাদের দুচোখে স্বপ্ন ভবিষ্যতের পরিকল্পনা!
তাদের দিকে তাকিয়ে রোমানের মনে হলো, ট্রেনগুলো মানুষকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয় ঠিকই, কিন্তু স্টেশনটি চিরকাল তার শূন্যতা নিয়েই দাঁড়িয়ে থাকে। স্টেশনটি জানে, প্রতিটি মিলন ক্ষণস্থায়ী, আর প্রতিটি যাত্রা এক নতুন অপেক্ষার জন্ম দেয়। এই প্ল্যাটফর্মটি যাত্রীদের আসা-যাওয়ার সাক্ষী নয়, এটি হলো ভালোবাসার প্রতিশ্রুতি আর হারিয়ে যাওয়া সম্পর্কের অনন্ত প্রতীক্ষার প্রতীক।
ট্রেনটি হুইসেল বাজিয়ে চলে গেল। প্ল্যাটফর্ম আবার শান্ত, কেবল বাতাসে ধুলো উড়ছে।
রোমান পকেট থেকে ভাঁজ করা একটা পুরোনো চিঠি বের করল। রোহিনীর হাতের লেখা। শেষ দুটি লাইন এ রকম : “যদি কখনো পথ হারিয়ে ফেলো, স্টেশনে এসো। আমি না থাকলেও, আমার অপেক্ষাটা থাকবে।” চিঠি পড়া শেষে রোমানের দু চোখের পাতাগুলোকে বড্ড সিক্ত ও রিক্ত মনে হলো। তার ফ্যালফ্যাল চাহনিতে অসহায়ত্বের ছাপ। হাতের টিস্যু ভিজে উঠল চোখের ছোঁয়ায়!
রোমান চিঠিটা আবার ভাঁজ দিয়ে যত্ন করে পকেটে রেখে দিলো। মনে মনে ভাবলো আজ সে ফিরবে না। তার গন্তব্য পাল্টে গেছে। সে এখন জানে—তার জীবন এখন আর ট্রেন বা গন্তব্যের উপর নির্ভরশীল নয়।
সে শুধু অপেক্ষমান প্ল্যাটফর্ম-এর নৈঃশব্দ্যের সাথে মিশে থাকার জন্য অপেক্ষা করবে।