মো: মাহে আলম আখন
সন্তান হচ্ছে পিতা-মাতার জন্য সবচেয়ে বড় নিয়ামত ও মুল্যবান সম্পদ। এই সম্পদ দ্বারা মানুষ দুনিয়া ও আখেরাতে উপকৃত হয়ে থাকেন। একজন আদর্শ সন্তান পিতা- মাতার জন্য সুখ- শান্তির অন্যতম মাধ্যম। হযরত আবু হুরায়রা রা. হতে বর্ণিত, রাসূল (স) বলেছেন- মানুষ যখন মৃত্যু বরন করেন, তখন থেকে তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল চালু থাকে। সেগুলো হলো:-
১.সাদকায়ে জারিয়া
২.উপকারি এলেম
৩. নেক সন্তান( সহীহ মুসলিম হাদীস নং ১৯৩১)
সুতারং সন্তানের প্রতি পিতা- মাতার দায়িত্ব ও কর্তব্য অনেক বেশী।
সন্তানকে যথাযথভাবে প্রতিপালন করা ও তাদের নৈতিকতার উন্নয়নে পিতা- মাতা যত্নবান না হ’লে অথবা অর্পিত দায়িত্ব পালন না করলে সন্তানের ভবিষ্যৎ হয়ে উঠে দুর্বিসহ। কাজেই পিতা - মাতা সন্তানের সঙ্গে বৈরী মনোভাব পরিহার করে বন্ধুসুলভ আচরণ করবেন। সর্বদা সন্তানের সঙ্গে কোমল ব্যবহার করবেন, আদর ও স্নেহ করবেন এবং প্রয়োজনে নছীহত করবেন।
সন্তানের জন্য করনীয় বিষয়গুলো হলো:-
কানে আযান ও ইকামাত দেওয়া :একজন শিশু যখন জন্মগ্রহণ করে তখন তার মন থাকে সম্পূর্ণরূপে পূতপবিত্র ও নিষ্পাপ। সে সময় তাকে সর্বপ্রথম যে বাক্য শুনানো হবে, সেটাই হবে তার সারাজীবনের চলার পাথেয়। ইসলাম স্বভাবজাত আদর্শ। এ আদর্শের বাণী তার কর্ণকুহুরে প্রবেশ করলে, সে নিজেকে এ পথের অনুসারী বানাবার প্রয়াস চালাবে সারাটি জীবন। কুরআন মাজীদে এরশাদ হয়েছে, "এ হচ্ছে আল্লাহর ঐ ফিৎরাত (প্রকৃতিজাত আদর্শ) যার উপর সমস্ত মানবগোষ্ঠীকে তিনি সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই। এটাই সঠিক-সুন্দর দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ তা জানে না" (সুরা -রূম ৩০)।
তাহনীক করা: খেজুর চিবিয়ে সেই চর্বিত খেজুর নবজাতকের মুখে দেয়াকে তাহনীক বলে। আবু মূসা আশ‘আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, "আমার একটি শিশু সন্তান জন্মগ্রহণ করলে আমি তাকে রাসূলুল্লাহ (স:)-এর খেদমতে পেশ করলাম। তিনি তার নাম রাখলেন ইবরাহীম আর খেজুর দ্বারা তার তাহনীক করলেন এবং তার জন্য বরকতের দো‘আ করে তাকে আমার নিকট ফিরিয়ে দিলেন"।
সুন্দর নাম রাখা : শিশু জন্মের পর তার একটি সুন্দর ইসলামি নাম রাখা প্রত্যেক মুসলিম পিতা- মাতার দায়িত্ব। সহীহ মুসলিমে বর্ণিত আছে, রাসূল(স:) বলেছেন,তোমাদের নাম সমুহের মধ্যে আল্লাহ নিকট সবচেয়ে উত্তম নাম হলো আবদুল্লাহ ও আবদুর রহমান।
আকিকা করা:
আযান ইকামত নাম রাখা ও মাথা মুন্ডানোর পর আকীক্বাহ করতে হবে। আকীক্বাহ সুন্নাত। সন্তান ভুমিষ্ঠ হওয়ার সপ্তম দিনে আকীক্বাহ করা মুস্তাহাব। ছেলে হলে দুটি ভেড়া বা বকরী। মেয়ে হলে একটি।সপ্তম দিনে না পারলে চৌদ্দ দিনের মাথায় আকীক্বাহ করবে তাও না পারলে ২১ দিনে করবে। তাও যদি না পারে তাহলে যে কোন দিন করলে আদায় হয়ে যাবে। তবে মুস্তাহাব আকীক্বার দাবি আদায় হবে না। আকীক্বাহ সম্পর্কে হাদিসে আছে রাসূলুল্লাহ (সাঃ) ইরশাদ করেন-
”শিশু তার আকীক্বাহ’র বিনিময়ে (আল্লাহর নিকট) বন্দক স্বরুপ থাকে। কাজেই সপ্তম দিনে তার পক্ষ হতে আকীক্বাহ করবে, তার মাথা মুন্ডন ও নাম রাখবে।”
খাওয়ার আদব শেখানো:
বাচ্চা যখন থেকে খাওয়া শুরু করবে, তখন তাকে হাতে ধরে ধরে খাওয়াবে। খাওয়ার আদব শেখাবে- ডান হাতে খাবে, বাম হাতে খাবে না। কেন না – শয়তান বাম হাতে খায়। বিসমিল্লাহ বলে খাবে, আলহামদুলিল্লাহ বলে শেষ করবে।
খাৎনা বা মুসলমানি করা:
বাচ্চার বয়স যখন ছয় অথবা সাত বছর হবে তখন তার খাৎনা-মুসলমানি করাতে হবে। খাৎনা সুন্নতে ইবরাহীম। সর্বপ্রথম খাৎনা হযরত ইবরাহীম (আ.) করেছেন। এই সুন্নতে ইবরাহীম কে আল্লাহ তা’য়ালা এ উম্মতের জন্য পালনীয় করেছেন।
নামাজ শিক্ষা দেওয়া : নামাজের অপরিসীম গুরুত্বের কারণে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শৈশব-কৈশোর থেকেই সন্তানকে সালাতে অভ্যস্ত করাতে বলেছেন।
আমর বিন শুয়াইব তার পিতা ও দাদার সূত্রে বর্ণনা করেন: রাসূল ( স:) বলেন, " তোমাদের সন্তানদের বয়স সাত বছর হলে তাদেরকে নামাজের আদেশ দাও, তাদের বয়স দশ বছর হলে এজন্য তাদের প্রহার করো এবং তাদের বিছানা পৃথক করে দাও।"( আবু দাউদ)
দ্বীনি এলেম শিক্ষা দেওয়া : সন্তান মা-বাবার নিকট আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে আমানত। তাদেরকে দ্বীন শিক্ষা দেওয়া, শরীয়তের প্রয়োজনীয় বিষয়াদি শেখানো এবং একজন ঈমানদার মানুষ হিসাবে গড়ে তোলা মা-বাবা ও অভিভাবকের কর্তব্য। আজ বৈষয়িক শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং চাকরি ও উপার্জনক্ষম করে গড়ে তোলাকেই শুধু দায়িত্ব মনে করা হয়। এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, সন্তানকে হালাল ও বৈধ পন্থায় আয়-রোজগার শেখানোও পিতামাতার কর্তব্য। কিন্তু এটিই একমাত্র দায়িত্ব নয়; বরং তাদেরকে ইসলামী সভ্যতা (তাহযীব) শেখানো, দ্বীন ও শরীয়তের মৌলিক বিষয়াদি শেখানো এবং একজন দ্বীনদার-নামাযী ও প্রকৃত মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাও মা-বাবার দায়িত্ব ও কর্তব্য। হাদীস শরীফে এসেছে- ‘জেনে রেখ, তোমরা প্রত্যেকে দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককে তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। পুরুষ তার পরিবারবর্গের ব্যাপারে দায়িত্বশীল। তাদের ব্যাপারে তাকে জবাবদিহি করতে হবে।’ -সহীহ বুখারী ১/২২২ হাদীস ৮৯৩
সুসন্তান যেমন মা-বাবার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের বড় সম্পদ এবং সদকা জারিয়া তেমনি সন্তান যদি দ্বীন ও শরীয়তের অনুগত না থাকে, দুর্নীতি ও গুনাহে লিপ্ত হয়ে যায় তাহলে সে উভয় জগতেই মা-বাবার জন্য বিপদ। দুনিয়াতে লাঞ্ছনা, বঞ্চনা ও পেরেশানির কারণ। আর কবরে থেকেও মা-বাবা তার গুনাহর ফল ভোগ করতে থাকবে। আখিরাতে এই আদরের সন্তানই আল্লাহ তা'আলার দরবারে মা-বাবার বিরুদ্ধে আপিল করবে যে, তারা আমাকে দ্বীন শেখায়নি। তাদের দায়িত্ব পালন করেনি। তাই এই আমানতের হক আদায়ের প্রতি খুবই যত্নবান হতে হবে।
বিজাতীয় রীতিনীতি ও ফ্যাশন প্রীতি:
কুরআন-হাদীসের একটি মৌলিক শিক্ষা হল, আচার-ব্যবহার, সাজসজ্জা, কৃষ্টি-কালচার ইত্যাদিতে ইসলামী স্বাতন্ত্রবোধ থাকা। এসব ক্ষেত্রে বিজাতীয় অনুকরণকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এটা দ্বীনের গুরুত্বপূর্ণ বিধান। এ সম্পর্কে কুরআন-হাদীসে অসংখ্য হেদায়েত রয়েছে।
নৈতিক শিক্ষা দেওয়া : প্রত্যেক পিতা মাতার দায়িত্ব হলো সন্তানকে নৈতিক শিক্ষা দেওয়া। হালাল গ্রহণ এবং হারাম বর্জণ সমন্ধে শিক্ষা দেওয়া।
হাদিস শরিফে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘জেনে রাখো, শরীরের মধ্যে একটি গোশতের টুকরা (মুদগাহ) আছে, তা যখন ঠিক হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন ঠিক হয়ে যায়। আর তা যখন খারাপ হয়ে যায়, গোটা শরীর তখন খারাপ হয়ে যায়। জেনে রাখো, সে গোশতের টুকরাটি হলো কলব।’ (বুখারি শরিফ, হাদিস: ৫০)।
সর্বোপরি, সন্তানকে সুশিক্ষিত করে সুন্দর মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলা প্রত্যেক পিতা - মাতার দায়িত্ব।
Website: www.ichchashakti.com E-mail: ichchashaktipublication@gmail.com