প্রতিবদেন ডেস্কঃ আব্দুল কাদের
সোনালী রৌদ্দুরমাখা শীতের সকাল কার না ভালো লাগে! কুয়াশার নিবিড় চাদর ভেদ করে যখন ভোরের সূর্য উঁকি দেয়, তখন সেই নরম আলো যেন মানুষের জীবনের রূপনগরে এক অনাবিল আনন্দের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি করে। শীতের এই মিঠে রোদ কেবল শারীরিক উষ্ণতা নয়, বরং যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি মুছে দিয়ে মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি বিলিয়ে দেয়। অথচ কুয়াশা ঢাকা দিনগুলোতে প্রকৃতির রূপ বদলে যায় এক নিমিষেই। সূর্য যখন আড়ালে থাকে, তখন হিমেল হাওয়ার দাপটে মানুষ জবুথবু হয়ে লেপের ওমে বন্দি থাকে; খুব প্রয়োজন ছাড়া ঘরের জানালার কপাটটিও খুলতে চায় না। নাগরিক জীবনের ব্যস্ততায় বিশেষ করে ঢাকা শহরে শীতের প্রকোপ তেমন একটা অনুভূত না হলেও, রাতের শেষ প্রহরে যখন তিলোত্তমা নগরী স্তব্ধ হয়ে আসে, তখনই কেবল হালকা হিমের পরশ পাওয়া যায়।
গ্রামবাংলার শীতের চিত্রটি চিরকালই বৈচিত্র্যময় ও সংবেদনশীল। শীত নিবারণে গ্রামের সাধারণ মানুষের খড়কুটো জ্বালিয়ে আগুন পোহানোর সেই চিরায়ত দৃশ্য আজও চোখে পড়ে। ভোরের আলো ফোটার আগেই গৃহবধূরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন হেঁসেলের কাজে। আগুনের সেই ওমে হাত-পা গরম করে নেওয়া আর ধোঁয়া ওঠা পিঠার ঘ্রাণে মুখরিত সেই সকালগুলো আমাদের আবহমান বাংলার সংস্কৃতির অংশ। কিন্তু সময়ের অমোঘ নিয়মে এই গ্রামীণ জীবনেও আজ পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে।
একসময় শীতকাল মানেই ছিল উৎসবের ঋতু। পাড়ায় পাড়ায় বসত পথনাটক, যাত্রাপালা আর পালাগানের জমজমাট আসর। সেই সংস্কৃতির রেশ এখন অনেকটা বিলুপ্তির পথে। কালের বিবর্তনে এবং আধুনিকতার রুক্ষ স্পর্শে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমগুলো। আগেকার দিনের সেই ধ্রুপদী ঢঙের পালাগানের জায়গা দখল করে নিয়েছে উচ্চশব্দের ‘ডিস্ক গান’ আর কৃত্রিম নৃত্য। যেখানে সুরের মায়াবী মূর্ছনার চেয়ে দেহজ অঙ্গভঙ্গি প্রদর্শন করে সস্তা দর্শক মাতানোর প্রবণতাই আজ প্রবল। বিনোদনের এই বিচ্যুতি আমাদের রুচিবোধের সংকটেরই পরিচয় দেয়।
আশ্চর্যের বিষয় হলো, একসময়ের জনপ্রিয় সেই পালাগান বা নাটকের মঞ্চগুলো আজ স্থিমিত হয়ে পড়েছে। সেই শূন্যস্থান দখল করে নিয়েছে ধর্মীয় ওয়াজ মাহফিলের আধিক্য। ধর্মীয় আলোচনা আগেও ছিল, তবে সংস্কৃতির মূলধারা থেকে সুস্থ বিনোদনের মাধ্যমগুলো হারিয়ে যাওয়ায় জনমানুষের জমায়েতের কেন্দ্রবিন্দু এখন পুরোপুরি বদলে গেছে। ঐতিহ্যের এই পালাবদল আমাদের গ্রামীণ সমাজের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের এক বড় দলিল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শীতের সকালের সেই সোনালী রোদ আজও ওঠে, কিন্তু সেই রোদের নিচে দাঁড়িয়ে যাত্রাপালার মহড়া কিংবা পালাগানের সুর আর শোনা যায় না। আমাদের ঐতিহ্যবাহী এই লোকজ সংস্কৃতিকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা আজ সময়ের দাবি। আধুনিকতার ভিড়ে আমরা যদি আমাদের শেকড়কে হারিয়ে ফেলি, তবে আগামীর প্রজন্মের কাছে এই সোনালী সকালের গল্পের পূর্ণতা কোনোদিনই ঘটবে না।
Website: www.ichchashakti.com E-mail: ichchashaktipublication@gmail.com