শফিউর রহমান
আমার নাম সায়ন।
লোকজন বলে আমি নাকি অদ্ভুত। আমি কখনো প্রতিবাদ করি না। মনে করি—মানুষ অদ্ভুত হওয়াটাই স্বাভাবিক। যারা খুব স্বাভাবিক, তাদের ভেতরে সবচেয়ে বেশি সমস্যা থাকে।
চাকরি করছি না। বেকার। মা বিষয়টা নিয়ে খুব চিন্তিত। প্রতিদিন সকালে একই কথা—
“কোনো একটা কিছু কর সায়ন। শীত পড়ে গেছে। মানুষজন উল আর সোয়েটার বিক্রি করছে, তুই অন্তত স্টিকার বিক্রি কর।”
আমি মাথা নেড়ে বলি—
“স্টিকার বিক্রি করতে হলে স্টিকার থাকতে হয় মা।”
মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। শীতের সকালে দীর্ঘশ্বাসগুলো খুব ঘন হয়ে যায়। যেন বাতাসে কুয়াশার সাথে মিশে যায়।
আমাদের বাড়িটা পুরনো। দরজাটা ঠিকমতো আটকায় না। ঠাণ্ডা বাতাস ঢুকে এসে বলে যায়—“কেমন আছো?”
আমি ভাবি—বাতাস যদি কথা বলতে পারত, হয়তো আমার সাথে বেশ বন্ধুত্ব হতো।
একদিন বিকেলে মা বলল—
“চা খেয়ে বের হ। একটু হাঁটলে মন ভালো হয়।”
আমি বললাম—
“মন তো আমার বেশ ভালোই আছে।”
মা তাকিয়ে রইল।
“ভালো থাকলে তোর চোখে এত শূন্যতা কেন?”
আমি উত্তর দিলাম না। কারণ শীতের দিনে মানুষের চোখে শূন্যতা থাকাটা খুব স্বাভাবিক। রোদের মতো মানুষও মাঝে মাঝে লুকিয়ে যায়।
আমি হাঁটতে বের হলাম। রাস্তা কুয়াশায় ধূসর। বাতির আলোগুলো এমন ঝাপসা, যেন কেউ কাঁচে নিঃশ্বাস ফেলে বাষ্প জমিয়ে রেখেছে।
রাস্তার মোড়ে একটা চায়ের দোকান। ধোঁয়ার ভেতর দাঁড়িয়ে একজন মেয়ে। হলুদ শাল। চুলগুলো কাঁধে নেমে এসেছে। মুখে এমন এক নীরবতা—মনে হয় কথা বললেও শব্দ খুব আস্তে বের হবে।
আমি পাশ কাটিয়ে যাবো। ঠিক তখনই—
“এই যে, সায়ন!”
আমি থেমে গেলাম।
“তুমি আমাকে চেনো?”
মেয়েটা হেসে বলল—
“বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলা বিভাগ। তিন বছর একই করিডরে হেঁটেছি। তুমি শুধু আকাশ দেখেছো। মানুষ দেখোনি।”
আমি বললাম—
“মানুষ দেখার চাইতে আকাশ দেখা জরুরি। মানুষ পড়ে না, আকাশ পড়লে বিপদ।”
মেয়েটা হাসল। শীতের বিকেলে এমন হাসি খুব কম দেখা যায়।
“আমার নাম মনে আছে?”—সে জিজ্ঞেস করল।
আমি একটু ভেবে বললাম—
“তোমার নাম মেঘলা।”
ও অবাক হলো।
“কীভাবে বুঝলে?”
আমি গম্ভীর হয়ে বললাম—
“তোমাকে দেখলে মনে হয় কেউ বৃষ্টির জন্য অপেক্ষা করছে।”
মেঘলা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল—
“তুমি এখনও চাকরি পাওনি, তাই না?”
আমি হেসে বললাম—
“চাকরি আমাকে খুঁজে পায়নি। আমি অপেক্ষায় আছি।”
“ভয় লাগে না?”
“কিসের?”
“ভবিষ্যৎ।”
আমি চায়ের দিকে তাকিয়ে বললাম—
“ভবিষ্যৎ হচ্ছে সস্তা বিস্কুটের মতো। থাকলে খাওয়া যায়, না থাকলেও চা চলে।”
মেঘলা হেসে ফেলল।
“তুমি একদম বদলায়নি।”
আমি বললাম—
“মানুষ বদলায় না। শুধু শীত বাড়ে।”
ও চা শেষ করল। তারপর হঠাৎ বলল—
“চল, হাঁটি।”
আমি জিজ্ঞেস করলাম—
“উদ্দেশ্য কী?”
“কোনো উদ্দেশ্য নেই।”
আমি মাথা নেড়ে বললাম—
“উদ্দেশ্যহীন কাজগুলোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।”
আমরা পাশাপাশি হাঁটতে লাগলাম। বাতাস কাঁপছে। গাছের ডালে শুকনো পাতা টুপটাপ পড়ে। কুকুরগুলো গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। শহরটা যেন গোপনে নিঃশ্বাস ফেলছে।
মেঘলা বলল—
“তুমি জানো, তুমি খুব একা দেখাও।”
আমি বললাম—
“একাকীত্ব হলো জ্বরের মতো। মানুষ নিজে নিজে ভালো হয়ে যায়।”
“তুমি খুশি?”
“হাত গরম আছে, চা খেয়েছি, বাতাস নরম—খুশি হওয়ার জন্য এর চাইতে বেশি কী লাগে?”
মেঘলা একটু থামল।
“তুমি জানো, তোমার সাথে কথা বললে মনে হয় জীবন সহজ।”
আমি বললাম—
“জীবন সহজই। আমরা শুধু তাকে কঠিন সাজাই।”
কিছুক্ষণ নীরবতা। কুয়াশার ভেতর দিয়ে রাস্তার আলো কেমন মোমবাতির মতো জ্বলছে।
মেঘলা ধীরে বলল—
“সায়ন, যদি খুব ঠাণ্ডা লাগে, মানুষের পাশে দাঁড়ালেই উষ্ণ লাগে।”
আমি উত্তর দিলাম না। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তে মনে হলো—
শীত একটু কমে গেছে।
দ্বিতীয় দেখা
পরদিন দুপুরে মা বলল—
“একটু বাজারে গিয়ে ডিম নিয়ে আয়।”
আমি বললাম—
“মা, ডিমের দাম শুনে ভয় পাই।”
মা বলল—
“ডিম যতই দামি হোক, মানুষকে খেতে হয়। তুইও মানুষ।”
আমি ভাবলাম—এই যুক্তি অখণ্ড। বাজারে গিয়ে দেখি—ডিম সত্যিই খুব দাম। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ডিমের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছি, যেন ওগুলো পৃথিবীর শেষ সম্পদ।
ঠিক তখন পিছন থেকে একটা গলা—
“সায়ন?”
ঘুরে দেখি—মেঘলা। হাতে ছাতা, যদিও রোদ নেই।
“তুমি এখানে?”—আমি জিজ্ঞেস করলাম।
মেঘলা বলল—
“বাজার তো মানুষরাই করে।”
আমি বললাম—
“আমি মানুষ নই, আমি বেকার প্রজাতির বিরল নমুনা।”
মেঘলা ছোট্ট করে হাসল।
“চলো, চা খাই।”
আমি বললাম—
“চায়ের জন্য টাকা নেই।”
“আমি খাওয়াবো।”
“কেন?”
“কারণ তুমি এমন কথা বলো, যা কেউ বলে না।”
চায়ের দোকানে বসে মেঘলা জিজ্ঞেস করল—
“তোমার কোনো স্বপ্ন নেই?”
আমি বললাম—
“আছে।”
“কী?”
আমি চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম—
“একদিন খুব রোদের সকালে ঘুম থেকে উঠে মনে হবে—আমি আর একা নই।”
মেঘলা তাকিয়ে রইল। তার চোখে কুয়াশার মতো নরম আলো।
“সায়ন…”—ও ধীরে বলল—
“তুমি কি জানো, কখনো কখনো মানুষ চাকরি হয়ে আসে না… আশ্রয় হয়ে আসে?”
আমি কিছু বললাম না।
কারণ অনুভূতিগুলো শব্দের চেয়ে নিঃশব্দে বেশি স্পষ্ট।
শেষ কথা
সেদিন রাতে ঘরে ফিরে দেখি ঠাণ্ডা ভয়ানক। কম্বলটা মায়ের গায়ে দিলাম। মা বলল—
“তোর লাগবে না?”
আমি হাসলাম—
“আজ শীত কম।”
মা অবাক হয়ে বলল—
“কম হলো কেমন করে?”
আমি জানালার দিকে তাকিয়ে বললাম—
“কারণ আজকে কেউ আমার পাশে দাঁড়িয়েছিল।”
শীত তখনো আছে। কুয়াশাও আছে।
কিন্তু ভেতরে কোথাও একটা অদ্ভুত উষ্ণতা।
আমি নিজের মনে বললাম—
শীত স্থায়ী না।
বেকারত্বও না।
কিছু মানুষ জীবনে রোদ হয়ে আসে।
আর আমার মনে হলো—
মেঘলা হয়তো সেই রোদ।
Website: www.ichchashakti.com E-mail: ichchashaktipublication@gmail.com