পথশিশু
মাহমুদ হাফিজ
আলগোছে বেয়ে পড়ছে শাফিনের মুখ থেতলে যাওয়ার রুক্ত। পরনের ছেঁড়াফাঁড়া শার্টের পেছনের অংশে রক্ত জমে গেছে।যে-কেউ শাফিনের লাশটা দেখে বলতে পারবে, মরদেহটা দুই-আড়াইঘন্টা আগের। এতো সময় হয়ে গেল এখন অব্দি লাশটা কেউ ছুয়েঁ দেখেনি। অবশ্য তামাশা দেখতে কয়েকজন জড়ো হয়েছে। । ফটো নিচ্ছে কেউ-কেউ। দায় এড়াতে লোকজন কিছুসময় দাঁড়িয়েই কেটে পড়ছে। এরকম হওয়াটাই স্বাভাবিক। স্বার্থ ছাড়া কে-ই-বা ছুঁতে যাবে অজ্ঞাত বালকের লাশ!
শীতের আকাশে সূর্য হেলতে-হেলতে দিনের ওপাড়ে এনে দিয়েছে মায়াবি বিকেল। আসরের নামাজ শেষে চা-স্টলে আড্ডা দিতে দৌড় এগোচ্ছে কর্ম বিরতির লোকজন। এমন সময় পুলিশ এম্বুলেন্স অলস ভঙ্গিতে এসে দাঁড়াল।স্ট্যাচার নিয়ে গাড়ি থেকে নামলো দুজন ওয়েটার বয়। উঠিয়ে নিয়ে গেল তারা শাফিনের লাশ।
লাশের সাথে মানুষের বোধহয় একটা সম্পর্ক আছে। তাইতো একজন মানুষ লাশ হলে অন্যরা কাঁদে। বুক ভাষায় কেঁদেকেটে। কিন্তু সবমানুষ লাশ হলেই কান্নার লোক থাকে না। যেমন শাফিন। শাফিনের মতো ছেলেরা লাশ হলে কেউ কাঁদে না। জানায় না সমবেদনা। ওদের অপরাধ ওরা পথশিশু। এই সমাজ পথশিশুকে মানুষের পরিচয়ে দেখে না। হয়তো এজন্যই ওরা প্রাণীর স্বভাব-চরিত্র নিয়ে বেড়ে উঠে। দুনিয়ার সফলতা ওরা চিনেনা এজন্যই।
শাফিন এতিম এক ছেলে। কেউ ছিল না ওর। এক বুড়িমা শাফিনকে নাতির মত বড় করেছে ছোটবেলা থেকেই। হাত-পা সচল হবার দিন থেকেই 'ও' কাগজ টুকাত পথে-পথে। কোথাও কিছু পেলে খেয়ে নিতো। ক্লান্তি ভর করলে জায়গাতেই শুয়ে পড়ত ;ঘুমিয়ে যেত সেখানেই । অনেক সময় রাতও কাটিয়ে দিত বাইরে। একটা পত্রিকা বিছিয়ে ঘুমিয়ে যেত ফুটওভার ব্রীজে। অথচ শীত খুব পরিমাণ। স্বাভাবিক থাকা যায় না গরম কাপড় ছাড়া। বুড়িমা ওরে বারণ করেছে বাইরে থাকতে। জ্বর- ঠান্ডার ভয় দেখিয়েছে। কথা শোনেনি, এক পর্যায়ে জ্বর ওকে কাঁত করে ফেলে।
একদিন বিকেল বেলায় জ্বর নিয়েই হঠাৎ বাইরে যায় কাগজ কুড়াতে। শরীর খারাপ করে ওঠে হঠাৎ। ব্যস্ত নগরী কাওরান বাজারের রোডে থমকে দাঁড়ায়। মাথায় হাত রেখে বসতে যাবে তখনই লোকাল বাস ওকে চেপে ধরে। পড়ে যায় সেখানেই। বাসটার পেছনে থাকা অটো- বাইকের চাকা মাথাটা থেতলে দেয়। শাফিন কিছুক্ষণ গলাকাটা মুরগীর মত লাফাতে থাকে, এক দেড় মিনিটেই মারা যায়।
শাফিনের মৃত্যুর ঘটনা প্রত্যক্ষ করেছেন বুড়িমা। বয়সের ভারে তিনি ন্যুব্জ্য। সঙ্গে-সঙ্গে আসতে পারেননি শাফিনের কাছে। অনেক কষ্টে এখন এসে পৌঁছেছেন। ততক্ষণে লাশ পুলিশের হাতে।
অবলোকন করা ঘটনা শোনাচ্ছেন বুড়িমা। কেঁদে কেঁদে বলছেন বেপরোয়া যান চলাচল থামবে কবে। কোনদিন পথ-মানুষরা বাঁচবার নিশ্চয়তা পাবে।
বুড়িমার চোখে জল। চাহনিতে হাজারো অভিযোগ। বোঝার ক্ষমতা কার আছে এই অভিযোগের ভাষা।
Website: www.ichchashakti.com E-mail: ichchashaktipublication@gmail.com