মোঃ আব্দুর রাজ্জাক রঞ্জু
শিউলি ছোঁয়া শেষ শরতের নরম রোদ গায়ে মেখে অরণ্য হাঁটছিল, গ্রামের সেই চেনা কাঁচা রাস্তা ধরে। রাতের শিশির তখনও পুরোপুরি শুকায়নি। দূর্বা ঘাসে পা ফেলতেই শুভ্র হিমেল স্পর্শ অনুভূত হলো তার হৃদয়ে। মায়াবী স্পর্শ জেগে উঠল তার হৃদয়। মনে হলো—
এ পথেই তো একদিন নীলা তার হাতটা ধরে বলেছিল, "চলো, সূর্যের আলোটা দেখি দু’জনে।"
অরণ্যের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটে উঠল।
শিউলি গাছটির নিচে এসে সে থমকে দাঁড়াল। গাছের গোড়ায় সাদা পাপড়ির বিছানাটা যেন আজও নীলার জন্য অপেক্ষা করে আছে। এই শিউলি তলায় এলেই, অরণ্য কেমন জানি আনমনা হয়ে যায়। স্মৃতি তাকে টেনে নিয়ে যায় দূরে কোথাও। শিউলি গাছ ও শিউলিতলা ছিল নীলার খুব পছন্দের। এ গাঁয়েরি মেয়ে নীলা। অরণ্য যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র তখন নীলা কলেজে সবে পা দিয়েছে। অরণ্যও এই গ্রামেরই ছেলে। দুজনের পরিচয় ও সখ্যতা বেশ আগে থেকেই।
অরণ্য যখন ভাবনার জগতে, ঠিক তখন পেছন থেকে একটি কণ্ঠ ভেসে এলো—
“এই ভোরবেলা এখানে? কিছু খুঁজছ, অরণ্য?”
পেছনে তাকিয়ে দেখে, গ্রামের বয়োজ্যেষ্ঠ শিক্ষক সাইদুল চাচা।
অরণ্য ম্লান হাসল।
অরণ্য: “খুঁজছি তো… হয়তো এমন কিছু, যা আর ফিরে পাওয়া যাবে না।"
চাচা: “নীলার কথা মনে পড়ছে?”
অরণ্য: “হ্যাঁ। এই শিউলি গাছটা দেখলেই ওর হাসি মনে পড়ে যায়। শিউলি ফুলের মতো হাসি-খুশি মেয়েটা। মনে হয়, এখানেই যেন দাঁড়িয়ে আছে।”
চাচা স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকালেন।
চাচা: “কেউ চলে গেলেও, তার পদচিহ্ন তো আর মুছে যায় না বাবা। তুমি অনুভব করছ, সেই তো বড় কথা।”
চাচা চলে গেলে আবার নেমে এল নীরবতা। অরণ্য গাছটার নিচে বসে একটি শিউলি হাতে তুলে নিল।
মনে হলো, নীলা ঠিক পাশেই বসে বলছে—
“জানো অরণ্য, শিউলির ঘ্রাণটাই আমার সবচেয়ে প্রিয়। মনে হয়, ভোরের আলোয় এরা হাসে…”
অরণ্য চোখ বন্ধ করতেই কথাগুলো যেন হাওয়ায় মিশে গেল।
বিকেলের দিকে অরণ্য হাঁটতে হাঁটতে নদীর ধারে আসে। নদীর জল ঝকঝক করছে রোদে। সেই আগের দিনগুলোর মতোই।
এখানে তারা দু’জনে বসে কত গল্প করত। ছোটখাটো খুনসুটির সাথে বাদাম ছিলে খেত।
ঠিক স্মৃতির মাঝেই হঠাৎ বাতাসে ভেসে এলো একটি পরিচিত কণ্ঠ—
“অরণ্য, দেখো! নদীটা কী সুন্দর না আজ?”
সে চমকে উঠে চারপাশে তাকাল। কেউ নেই।
নিজেকে নিজেই শান্ত করে নিতে বলল—
“নীলার কণ্ঠ হবে…........ এ বাতাসে আজও ও আছে।”
ধীরে ধীরে অরণ্য নদীর ধারে এসে বসে পড়লো।
রুবি দূর থেকে দেখছিল সব। সে কাছে এসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, "এত চুপচাপ কেন?"
অরণ্য: “মনে হলো কেউ ডাকলো…”
রুবি: “নীলা?”
অরণ্য একটু থেমে মাথা নেড়ে বলল—
“হয়তো।”
রুবি দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
রুবি: “তোমাদের দু’জনকে সত্যিই আলাদা করতে পারেনি কেউ। নীলা নেই, তবু তুমি যেন আগের মতোই তার সঙ্গে কথা বলো।”
অরণ্য: “সে তো আমার কাছে শুধু মানুষ ছিল না রুবি। ছিল অনুভূতি…...... ছিল আলো।”
রুবি আমতা আমতা করে বলল, "আচ্ছা অরণ্য ভাই, তুমি রুবি আপুকে এত ভালোবাসো, কিন্তু সে কিভাবে তোমার ভালোবাসার বন্ধন ছিন্ন করে স্বার্থপরের মতো চলে গেল?"
এ কথা শুনে অরণ্য বলল, "না রুবি, সে স্বার্থপর নয়। সবটা না জেনে তাকে স্বার্থপর বলো না।"
"তুমি সত্যি শুনতে চাও রুবি, সে কথা?"
"নিশ্চয়ই" বললো রুবি।
তাহলে শোনো। "সেদিনের শুরুটা ছিল খুবই আনন্দের। নৌকায় করে নদী দেখতে বের হয়েছিলাম অনেকের মতো আমরাও। নৌকা ও নদীর চমৎকার দৃশ্যের সাথে ছবি ও তোলা হয়েছিল অনেক। শেষ দিকে আকাশ হঠাৎ কালো মেঘে ছেয়ে যায়। মেঘের গর্জন আর বিজলী চমকাতে থাকে মুহুমুহু। নৌকাও পৌঁছে গিয়েছিল তীরের কাছাকাছি। নীলা আনন্দে এতটাই বিভোর ছিল যে সে একাই নৌকার শেড দেওয়া অংশ ছেড়ে একা একা চলে গিয়েছিল চালকের বিপরীত গলুইয়ে। ঠিক সে সময় আকস্মাৎ বজ্রপাতে ঘটে সেই অঘটন। আমরা সবাই বেঁচে গেলেও বাঁচতে পারেনি নীলা। মুহূর্তে ঝলছে যায় সে। তার নিথর দেহ ভাসে উত্তাল ঢেউয়ে। সবাইকে কাঁদিয়ে চলে যায় নীলা।"
নদীর ঢেউ তখন যেন হালকা দুলে উঠল।
অরণ্য সেদিকে তাকিয়ে বলল—
“দেখলে? ঢেউটাও ওঠে আজ ওর হাসির মতো।”
রুবি আর কিছু বলল না। শুধু দূরে তাকিয়ে দেখল, অরণ্য যেন এক অদৃশ্য ছায়ার সঙ্গে কথা বলছে—যে ছায়া তাকে ছেড়ে যায়নি। গোধূলি সন্ধ্যায় বিদায় নিয়ে বাড়ি ফিরে গেল রুবি।
রাত নেমে এলে রাতের আকাশে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়লো। অরণ্য নদীর ধারে ঘাসের গালিচায় বসলো। তার মনে হয় নীলা এসে বসেছে গা ঘেষে ঠিক পাশে।
নীলা যেন তাকে বলছে, “অরণ্য, প্রেম তো শুধু প্রাপ্তির জিনিস নয়। কখনো কখনো তা অনুপস্থিত থেকেও আমাদের জীবন ভরিয়ে তোলে।”
অরণ্য চুপচাপ শোনে।
তার চোখে জল এসে যায়, কিন্তু ঠোঁটে থাকে এক অদ্ভুত শান্তির হাসি।
অরণ্য:
“হ্যাঁ নীলা, তুমি নেই—কিন্তু তুমি আছো।
আমার দিনের আলোতে, শিউলি-সুগন্ধি ভোরে,
আমার প্রিয় নদী-জলে আছো তুমি।
আছো কাশফুল-হাওয়ায় মিশে।
তুমি আমার হৃদয়ের জমিনে হাঁটো সারাক্ষণ।”
রাত যত গভীর হয় চাঁদের আলো যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
অরণ্যের মনে হয়—
প্রিয় সেই পদচিহ্ন আজও স্পষ্ট, আজও বেঁচে আছে তার প্রতিটি শ্বাসে।
[গল্পকার: সহঃ অধ্যাপক, মহাস্থান মাহীসওয়ার ডিগ্রি কলেজ, বগুড়া ও সভাপতি, পুণ্ড্র সাহিত্য সংসদ, বগুড়া।
Website: www.ichchashakti.com E-mail: ichchashaktipublication@gmail.com