কবি ও সাংবাদিক: আনোয়ার হোসেন রনি
সুনামগঞ্জের শিল্পনগরী ছাতকের পূর্ব–উত্তর প্রান্তে আছে একটি শান্ত–নিবিড় গ্রাম—কালারুকা। পল্লির সরলতা, নদী–নালা, শস্য–শ্যামল রূপ, পাহাড়ি বাতাস ও মানুষের আন্তরিকতায় মোড়া এই গ্রামে জন্মেছিলেন এমন একজন আলোক পুরুষ, যিনি আজও সিলেটের ধর্ম–শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও মানবিক চেতনার আকাশে দীপের মতো জ্বলজ্বলে।
তিনি—শায়িরে আলা মাওলানা মুহাম্মাদ রাঈসুদ্দীন কালারুকী (রাহিমাহুল্লাহ)। একজন আলেম হয়েও তিনি ছিলেন কবির মতো সংবেদনশীল, বক্তার মতো সাবলীল, শিক্ষক–মুরব্বির মতো আন্তরিক, আবার সমাজ–আমলের মতো দৃঢ়, সৃজনশীল এবং দূরদর্শী। এক মানুষ—বহু পরিচয়ে। এক জীবন—অসংখ্য দৃষ্টান্তে।
তাঁর জীবন যেন শুধুই ব্যক্তিগত জীবনের ধারাবিবরণী নয়; বরং উত্তর সিলেটের ধর্মীয়–সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক পূর্ণাঙ্গ অধ্যায়। জন্ম থেকে ইন্তেকাল পর্যন্ত তাঁর জীবনের প্রতিটি পর্বে লুকিয়ে আছে জ্ঞান, পরিশ্রম, নৈতিকতা, আধ্যাত্মিকতা, শিল্পবোধ ও মানবসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত।
শৈশব: কালারুকার মাটিতে জন্মানো আলো
১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দ, ছাতক উপজেলার কালারুকা গ্রাম। গ্রামটি তখনো প্রাচীন বাংলার শান্ত–নিবিড় রূপ ধরে রেখেছে। মাটির ঘর, খড়ের ছাউনি, বাঁশঝাড়, সুরমা তীরের কাদামাটি, সাদাসিধা মানুষের জীবন, আর সর্বোপরি ধর্মীয় অনুরাগ—সব মিলিয়ে এক প্রাকৃতিক পাঠশালা।
এই সাধারণ পরিবেশেই জন্ম নেন রাঈসুদ্দীন, পিতা মরহুম রহমতুল্লাহ ও মাতার স্নেহে। ছয় ভাই–তিন বোনের মাঝখানে তৃতীয় সন্তান তিনি কৈশোরেই তাঁর চোখে জ্বলে উঠেছিল আলোর আকাঙ্ক্ষা—পড়বে, জানবে, বদলাবে মানুষকে।
সেই সময় গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষার অবকাঠামো খুব শক্তিশালী ছিল না। তবুও তাঁর শৈশবের প্রথম পাঠ শুরু হয় নিজ গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়েই। তারুণ্যের দৃষ্টিপাতে তখনই ফুটে উঠেছিল এক বিশেষ দীপ্তি—যে দীপ্তি পরে হয়ে ওঠে সিলেটের কাব্যিক জগৎকে আলোকিত করার স্বরলিপি।
হাসনাবাদ দারুল হাদীস মাদ্রাসা: ধর্ম–শিক্ষার প্রথম শিখা জ্বলে ওঠা ১৯৪৬ সাল।
তিনি ভর্তি হন হাসনাবাদ দারুল হাদীস মাদ্রাসায়, সিলেট অঞ্চলের ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান। এই শিক্ষা–যাত্রার শুরুতে তাঁর উপর যে আলোর রেখা পড়ে, তা আসে গ্রামের প্রখ্যাত আলেম—মৌলবী আর্শদ আলী (রাহ.)–এর কাছ থেকে। এই শিক্ষক তাঁর হৃদয়ে আলেমি চেতনার প্রথম বীজ বপন করেন—
“জ্ঞানের আলো নিয়ে চলবে, মানুষের অন্তর বদলাবে, সমাজকে সঠিক রাস্তায় আনবে।”
হাসনাবাদ মাদ্রাসা তাঁর চরিত্রে এনে দেয় দৃঢ়তা, শুদ্ধতা, শৃঙ্খলা।
কিন্তু তাঁর মেধা চাইছিল আরও বড় আকাশ, আরও প্রশস্ত পথ—গাছবাড়ি মাদ্রাসায় উচ্চশিক্ষা: যেখানে জ্ঞান, চরিত্র ও শিল্পবোধ মিলিত হয় ১৯৫০ সাল। উচ্চশিক্ষার তীব্র বাসনা তাঁকে নিয়ে যায় কানাইঘাট থানার প্রাচীন গাছবাড়ি জামিউল উলুম কামিল মাদ্রাসায়। এ প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস, অলিম্পাস–সম মর্যাদা এবং আলেম–উলামাদের সমাবেশ তাঁকে শুধু জ্ঞান নয়, আধ্যাত্মিকতা ও শিল্পবোধের নতুন জগতে প্রবেশ করায়।
তিনি ১৯৫৪ সালে আলিম,১৯৫৬ সালে ফাযিল,
১৯৫৮ সালে কামিল সম্পন্ন করেন। তবে তাঁর প্রকৃত অর্জন ছিল—শিক্ষার গভীরতা + চিন্তার বিস্তার + কাব্যিক অন্তর্দৃষ্টি + আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা। এখানেই তিনি আত্মিক–আলোকসমুদ্র আল্লামা ফুলতলী ছাহেব কিবলা (রাহ.)–এর স্নেহসান্নিধ্য লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি হন তাঁর ইজাযতপ্রাপ্ত খলিফা—এ সম্পর্ক তাঁর সারা জীবনের আধ্যাত্মিক ভিত্তি নির্মাণ করে।
গাছবাড়ির দিনগুলিতেই জন্ম নিল সেই ব্যক্তিত্ব—
যিনি পরবর্তীতে ‘শায়িরে আলা’ নামে সিলেটের হৃদয়ে স্থান করে নেবেন।
শিক্ষকতা, ইমামতি ও মানুষের মন–নির্মাণ
শিক্ষাজীবন শেষে তিনি দ্রুত প্রবেশ করেন কর্ম–জগতে—১৯৫৮–১৯৫৯: হাসনাবাদ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা ১৯৬০: বিশ্বনাথ দারুল উলুম আলিয়া মাদ্রাসা ১৯৬১–১৯৬৩: জামলাবাজ জামে মসজিদের ইমামতি এ সময় তাঁর ব্যক্তিত্বের তিনটি দিক দ্রুত ফুটে ওঠে—১. বক্তৃতা–কুশলতা:
তাঁর উপদেশ ছিল ছন্দময়, তীক্ষ্ণ, কিন্তু কোমল—
মানুষকে না কষ্ট দিয়ে মানুষ বদলে দেওয়ার মতো ভাষা। ২. কাব্য প্রতিভা:সঙ্গে ছিল তাৎক্ষণিক কবিতা রচনার অতুলনীয় ক্ষমতা। ৩. নৈতিকতা ও ধর্মীয় নেতৃত্ব: যে দৃঢ়তায় তিনি মানুষকে হক–বাতিল বোঝাতেন—তা ছিল বিরল। মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার গল্প: স্বপ্ন, সংগ্রাম, সাহস ও আলোর স্থাপত্য ১৯৬৭ সাল।
এক অবিস্মরণীয় বছর—যে বছরে রাঈসুদ্দীন কালারুকী ছাহেব প্রতিষ্ঠা করেন—কালারুকা লতিফিয়া ইসলামিয়া মাদ্রাসা নিজ মুর্শিদ ফুলতলী ছাহেব কিবলার প্রতি শ্রদ্ধাবোধ থেকেই ‘লতিফিয়া’ নামকরণ। প্রথম অবস্থান ছিল কালারুকা পয়েন্টের পশ্চিমে। কিছুদিন পর প্রাকৃতিক দুর্যোগে ভবন নষ্ট হলে তিনি নিজের অর্থে জমি কিনে মাদ্রাসা স্থানান্তর করেন বর্তমান অবস্থানে।
তিনি প্রায় ৩০ বছর এই প্রতিষ্ঠানের হেড মৌলানা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ৩০ বছরের ঘাম–অশ্রু–মেহনত–রাতজাগা পরিশ্রম মিলেই আজকের লতিফিয়া মাদ্রাসা: ২০০৭ সালে প্রথম দাখিল পরীক্ষার অনুমতি ২০১৯ সালে এমপিওভুক্ত ২০২৫ সালে আলিম বিভাগ পর্যন্ত নিয়মিত পাঠদান আজকের লতিফিয়া মাদ্রাসার প্রতিটি ইট–বালিতে মিশে আছে তাঁর জীবন–স্মৃতি, মেহনত, ত্যাগ ও দোয়ারা গড়া নির্মল আলো। শায়িরে আলা’ উপাধির পেছনের কিংবদন্তি ঘটনা তিনি ছিলেন ফার্সী, আরবি ও বাংলা কাব্যের এক অনন্য ভাণ্ডার।
মুখস্থ ছিল—গুলেস্তাঁ বোস্তাঁপাঁন্দেনামা সাবআ মুআল্লাক্কা জুলেখা করীমা প্রায় ১,০০০ স্তবক কবিতা শের–বাহা বা তাৎক্ষণিক গজল–সভায় তিনি ছিলেন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। উপাধির জন্মঃ
একদিন বিখ্যাত আলেম–কবি আল্লামা হরমুজ উল্লাহ শয়দা ছাব (রাহ.) এক অনুষ্ঠানের পর বলেন
“কালারুকী! আমরা এতক্ষণ বসলাম, একটা শে’রও বানাইতে পারলাম না। তুমি পারবা?”
আলো–অন্ধকারে দাঁড়িয়েই কালারুকী ছাহেব উচ্চারণ করলেন—“ইলাহী আতা কর রহমত মুছলছল, বমজলিছে শয়দায়ে আমরতল।”শয়দা ছাহ মুগ্ধ হয়ে উচ্চারণ করলেন—আজ থেকে আপনি শায়িরে আলা। এ উপাধি আজও সিলেট অঞ্চلے তাঁর একক অধিকারে। মুর্শিদের প্রতি প্রেম—যে প্রেম কবিতায় অমর ১৯৮৫ সালে দারুল ক্বিরাত মজিদিয়া ফুলতলী ট্রাস্টের মুখপত্রে প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত শে’র“ইলাহী, জোড় হস্তে মাংগি দুআ আমরা সব বেকলি,উজালা রাখিও সদায় ঝাঙায়ে ফুলতলী ইলাহী।”
আরও—“দরাজ করিও জনাব ফুলতলীর হায়াত ইলাহী। তাঁর দোয়াই যেন সত্যি হলো—রাঈসুদ্দীন ছাহেব ইন্তেকাল করেন ২০০৬ সালে,আর ফুলতলী ছাহেব কিবলা ২০০৮ সালে—মুর্শিদের জীবন বৃদ্ধিতে তাঁর দোয়ার প্রভাব মানুষের মনে গাঢ়ভাবে বিশ্বাস হিসেবে রয়ে গেছে। গ্রাম–জনপদে তাৎক্ষণিক শে’র—হৃদয় জয় করার সহজ জাদু তিনি যেখানে যেতেন সেখানে জায়গার নাম, মানুষের আবেগ, পরিবেশ—সব মিলিয়ে তাৎক্ষণিক শে’র রচনা করতেন।
কালারুকা নিয়ে তাঁর বিখ্যাত শে’র—“ইলাহী, এহছান করিও জারি দূর করিও সুস্তি,উজালা রাখিও সদায় কালারুকার বস্তি ইলাহী।”শ্রোতাদের উদ্দেশে বলতেন—“সবে কও আমীন, আমীন।”
মুহুর্মুহু আমীনের স্রোতে ভেসে যেত আসর।
প্রবাদ–স্রষ্টা কালারুকী হুজুর তাঁর ভাষা ছিল প্রজ্ঞার দীপ্তিতে উজ্জ্বল।
কিছু বিখ্যাত প্রবাদ—১. “দশে বেরলে রাজা, আর বাখলে বেরলে গাছ।”২. “মাইনষে ছিনে মানুষ, আর উলোশে ছিনে খেঁথা।”৩. “পরার মন্দ নিত নিত, নিজর মন্দ অচমপিত।”৪. “এক মন ইলমর লগে, দশ মন আখল লাগে।”৫. “বল ভালা আপনার বল, ছায়া ভালা বিরকর তল।”
এগুলো কেবল প্রবাদ নয়—এগুলো সমাজ–বাস্তবতার গভীর বিশ্লেষণ। উপদেশ—নীতির আলোকবাণী তাঁর উপদেশ মানুষকে বদলে দিত—
“নিজে ঠগা খাইলিও, কিন্তু পরারে ঠইগগো না।”
“যতোকান করবায়, অতোকান পাইবায়।” “খবরদার, কোনো দিন উস্তাদর লগে বিয়াদ্দবি কইরো না।”“ভাল মাইনষর পাও ধইলিও—কমিন–কমজারার মুখ ধইও না। উপদেশে ছিল বাস্তবতা + মমত্ব + দৃঢ়তা—এক অনন্য সংমিশ্রণ।
Website: www.ichchashakti.com E-mail: ichchashaktipublication@gmail.com